মানবজীবনের বিভিন্ন সংকট ও প্রতিকূলতার সময়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা এবং নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য মহানবী (সা.) উম্মতকে বেশ কিছু শক্তিশালী দোয়া ও আত্মিক সুরক্ষা কবচ শিখিয়ে গেছেন। প্রখ্যাত আলেম ইবনুল কাইয়ুম আল-জাওযিয়্যাহ (রহ.)-এর মতে, দোয়া হলো যাবতীয় বিপদ-আপদ দূর করার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। এটি একদিকে যেমন মুসিবতের আগমনকে রুখে দেয়, অন্যদিকে চলমান বিপদকে লাঘব বা সম্পূর্ণ দূর করতে সক্ষম।
প্রথমত, চরম আশাহীনতা এবং চারপাশ থেকে শত্রু বা প্রতিকূলতায় ঘেরাও হয়ে গেলে কোরআনের একটি বিশেষ দোয়ার আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। দোয়ার উচ্চারণ: “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”। এর অর্থ হলো, “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক ও কর্মবিধায়ক”। সুরা আলে ইমরানের ১৭৩ নম্বর আয়াতের এই বাক্যটি নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের সময় এবং ওহুদের যুদ্ধের চরম বিপর্যয়ে মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা পাঠ করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, দৈনন্দিন জীবনের আকস্মিক বিপদ, যেমন—রোগব্যাধি, বিষাক্ত প্রাণীর দংশন, শত্রুর অনিষ্ট বা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সকাল-সন্ধ্যায় একটি বর্মস্বরূপ দোয়া পাঠের কথা বলা হয়েছে। উচ্চারণটি হলো: “বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা‘আসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা-ই, ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম”। এর অর্থ—সেই আল্লাহর নামে শুরু করছি, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না; তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
তৃতীয়ত, তীব্র মানসিক অস্থিরতা, শোক এবং দুশ্চিন্তার সময়ে হৃদয়ে শান্তি আনতে মহানবী (সা.) একটি বিশেষ প্রার্থনা করতেন। এর উচ্চারণ: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযিমুল হালিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুল আরশিল আযিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রব্বুল আরদি ওয়া রব্বুল আরশিল কারিম”। এর অর্থ হলো, মহামহিম ও পরম ধৈর্যশীল আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনি আসমান, জমিন এবং সম্মানিত আরশের মালিক।
চতুর্থত, ঋণের বোঝা এবং পরনির্ভরতার কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সাহাবী আবু উমামাকে একটি দোয়া শিখিয়েছিলেন নবীজি (সা.)। দোয়াটি হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়া আউযু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসাল, ওয়া আউযু বিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখল, ওয়া আউযু বিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া ক্বাহরির রিজাল”। এর মাধ্যমে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, কৃপণতা এবং ঋণের চাপ ও মানুষের অন্যায় দমনের বিরুদ্ধে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়। আবু উমামা (রা.) এই দোয়া নিয়মিত পাঠ করে ঋণমুক্তি ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন বলে বর্ণনা করেছেন।
পঞ্চমত, জীবনের সার্বিক সংশোধন এবং নিজের প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মহানবী (সা.) তাঁর কন্যা ফাতেমা (রা.)-কে সকাল-সন্ধ্যায় একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করার অসিয়ত করেন। দোয়াটি হলো: “ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যূম, বিরাহমাতিকা আস্তাগিস, আসলিহ লী শা’নী কুল্লাহু, ওয়ালা তাকিলনী ইলা নাফসী তারফাতা আইন”। এর অর্থ—হে চিরঞ্জীব ও মহাবিশ্বের ধারক! আপনার রহমতের অসিলায় আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি; আমার সমস্ত অবস্থাকে সুন্দর ও সংশোধন করে দিন এবং চোখের পলকের জন্যও আমাকে আমার প্রবৃত্তির ওপর ছেড়ে দেবেন না।




