প্রায় ১০ মাস বন্ধ থাকার পর আবারও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। বৃহস্পতিবার কক্সবাজার থেকে এমভি বার আউলিয়া নামক জাহাজে করে ৮০০ পর্যটক দ্বীপে পৌঁছান। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় হোটেল মালিকদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ৮০০ পর্যটকের মধ্যে ৩০০ জন একই দিনে কক্সবাজার ফিরে গেলেও বাকি ৫০০ জন দ্বীপের বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে রাত যাপনের সিদ্ধান্ত নেন। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা জেটিঘাট থেকে যাত্রা শুরু করা জাহাজটি ৫ ঘণ্টা সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে দুপুর সোয়া একটার দিকে দ্বীপে নোঙর করে। দ্বীপে পৌঁছানোর পর স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা পর্যটকদের ফুল ও মিষ্টি দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটক আসা শুরু হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে।

দ্বীপের স্বচ্ছ নীল জলরাশি এবং প্রবাল পাথরে মুগ্ধ হয়ে অনেক পর্যটইক তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, সৈকতে দাঁড়িয়ে নীল জলের দৃশ্য তাঁর মন ভালো করে দিয়েছে এবং তিনি পরিবেশ রক্ষা করে প্রকৃতি উপভোগ করতে চান। একইভাবে ঢাকার ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম তাঁর পরিবারসহ প্রথমবার দ্বীপে এসেছেন এবং সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তি সেন্ট মার্টিনে পা রাখতেই দূর হয়ে গেছে বলে জানান। তবে পর্যটকদের আনন্দের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করছে প্রশাসন। বিশেষ করে দিয়ারমাথা সৈকতের দক্ষিণে অবস্থিত মাঝেরদিয়া ও ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ দুটি প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন হওয়ায় সেখানে পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করা পর্যটকদের কোস্টগার্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সদস্যরা বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ছেঁড়াদিয়ায় যাতায়াত রোধে লাল নিশানা ও তল্লাশি চৌকি স্থাপন করা হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকরা সেন্ট মার্টিনে ভ্রমণ ও রাত যাপন করতে পারবেন। তবে দ্বীপের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় সরকার ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছে, যা বাস্তবায়ন করতে তৎপর পরিবেশ অধিদপ্তর ও কোস্টগার্ড। এই নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ করা কিংবা বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ। এছাড়া কেয়া বন প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ-বিক্রয় এবং প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম বা রাজকাঁকড়ার ক্ষতি করা কঠোরভাবে দণ্ডনীয়। সৈকতে মোটরসাইকেল বা সি-বাইকের মতো মোটরচালিত যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য যেমন স্ট্র, প্লাস্টিক চামচ বা ছোট সাবান-শ্যাম্পুর প্যাকেট বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা এবং কোস্টগার্ডের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মারুফ আহমেদ জানান, পর্যটকদের সচেতন করতে এবং নিয়ম পালনে উৎসাহিত করতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

ভ্রমণের খরচ প্রসঙ্গে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) জানিয়েছে, একমুখী জাহাজভাড়া সর্বনিম্ন ১,৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা (কেবিন সুবিধা সহ) নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামীতে এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফসহ আরও কিছু জাহাজ এই রুটে যুক্ত হতে পারে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে অনুমোদিত জাহাজে পর্যটকরা যেতে পারবেন। গত বছরের অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি জাহাজের ফিটনেস যাচাই করা হচ্ছে। অতিরিক্ত পর্যটক ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে হুমকির মুখে পড়া এই দ্বীপটিকে বাঁচাতে দুই বছর আগে জারি করা ১২ দফা নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে সকল পর্যটককে।