প্রতিবছরের মতো এবারও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারী কিছু শিক্ষার্থীর জীবনগাথা অন্যের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট আর নানা বাধা পেরিয়ে যারা সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে, তাদের নিয়েই প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন। দিনে শ্রমিকের কাজ করে রাতে যে পড়াশোনা করেছে, কেউ আবার নিজের পড়ার খরচ তুলতে অন্যকে প্রাইভেট পড়িয়েছে—এমন চার শিক্ষার্থীর কথা উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। তবে উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, সেই দুশ্চিন্তা এখন তাদের পরিবারকে গ্রাস করছে।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের টুকারকান্দি গ্রামের জাহিদুল ইসলামের গল্প শুনলে চোখে জল আসে। দিনে একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ শেষে রাতে তিন-চার ঘণ্টা পড়ত সে। দশম শ্রেণিতে ওঠার পর স্কুলে যাওয়ার সুযোগই আর হয়নি তার। বই কেনার টাকা না থাকায় বন্ধুদের বইয়ের ছবি তুলে এনে সেগুলো দেখে পড়তে হতো তাকে। অবশেষে এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। আদমপুর দেওয়ান আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে এই ফল পেয়েছে জাহিদুল।

জাহিদুলের বাবা নজরুল ইসলাম ঢাকায় নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি করতেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চাকরি ছেড়ে তিনি গ্রামে ফিরে আসেন গবাদিপশু পালনের উদ্দেশ্যে। দুই লাখ টাকা দিয়ে একটি গাভি ও একটি ষাঁড় কেনেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অজ্ঞাত রোগে ষাঁড়টি মারা যায়। সাত মাসের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নজরুল ইসলাম। বাবার মৃত্যুর এক মাসের মধ্যে পরিবারের আরেকটি গরুও মারা গেলে সংসারে নেমে আসে বড় সংকট। তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত জাহিদুল। সংসারের অভাব দূর করতে সে কখনো কৃষিশ্রমিক, আবার কখনো ওয়ার্কশপে কাজ শুরু করে। নবম শ্রেণিতে উঠে নিজে প্রাইভেট না পড়লেও অন্য ছাত্রছাত্রীদের পড়াত, সেই আয় দিয়েই চলত তার নিজের পড়াশোনা।

তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট জাহিদুল। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। অন্য ভাইয়েরা প্রাথমিকের গণ্ডিও পার হতে পারেননি। এখন এক ভাই ও অসুস্থ মাকে নিয়ে তাদের সংসার। মা গোলাপ বানুর প্রতি মাসে তিন হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন। জাহিদুল জানায়, অনলাইনে ক্লাস করার জন্য ভাই তাকে একটি ফোন কিনে দিয়েছিলেন। বন্ধুদের কাছে গিয়ে বইয়ের ছবি তুলে আনত এবং অধ্যায়ের উত্তর ডাউনলোড করে পড়ত। এসএসসির ফরম পূরণেও সংকটে পড়েছিল সে; তখন শিক্ষকেরা তার কাছ থেকে কোচিং ফি হিসেবে দেড় হাজার টাকা নেননি। প্রধান শিক্ষক আয়েশা আক্তার বলেন, কাজের কারণে ছেলেটি নিয়মিত স্কুলে আসতে পারত না। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সে, যা তার নিজের চেষ্টা ও মেধার ফসল।

এসএসসি পরীক্ষা শেষে আবার নতুন কাজে যোগ দিয়েছে জাহিদুল। এখন মুন্সিগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করে। দিনে ১৪ ঘণ্টার কাজের বিনিময়ে মাসে বেতন পায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। বেতনের একটা অংশ ঋণ পরিশোধে যায়; এখনো ৬০ হাজার টাকা ঋণ বাকি। তার ইচ্ছা বুয়েটে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার, কিন্তু ১৪ ঘণ্টা কাজ করে কলেজের পড়াশোনা চালানো সম্ভব কি না—ভাবছে সে। আবার কাজ ছেড়ে দিলে খরচ জোগানোর কোনো উপায় নেই।

ফরিদপুর সদরের বাকচর এলাকার স্মরণিকা শিকদারের মা কনিকা শিকদারের নিজের পড়াশোনার স্বপ্ন পূরণ হয়নি; দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বিয়ে হয়ে যায়। তাই মেয়ের পড়াশোনায় কোনো কমতি রাখতে চাননি তিনি। মেয়ে যতক্ষণ পড়ত, পাশে বসে থাকতেন মা। এভাবে পড়ে খলিলপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে স্মরণিকা। তার বাবা স্বরূপ শিকদার খলিলপুর বাজারে ছোট একটি মুদিদোকান চালান। প্রতিদিন গড়ে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করত সে; কোনো গৃহশিক্ষক ছিল না। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সময় নিয়ে বুঝে নিত। স্মরণিকার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বা অর্থনীতি নিয়ে পড়া, পরে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া এবং বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া। তবে পারিবারিক আর্থিক অবস্থা নিয়ে সে চিন্তিত। তার মা বলেন, খলিলপুর বাজারের ছোট মুদিদোকানটিই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস; এই আয়ে সংসার চালানোই কঠিন, মেয়ের সামনের পড়াশোনার খরচ তো দূরের কথা। প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান শেখ জানান, স্মরণিকা অত্যন্ত মেধাবী; একটু সহযোগিতা পেলে তার স্বপ্নপূরণের পথ খুলে যেতে পারে।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অজপাড়া গ্রাম বারেঙ্গাকান্দার অষ্টমী রানী দাস নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে পড়াত। বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেত। ভালো পোশাক তো দূরের কথা, অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জোটেনি। এসব বাধা পেরিয়ে এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। উত্তর নাকশী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অষ্টমীর বাবা উপেন্দ্র চন্দ্র দাস পেশায় জেলে; সারা দিন মাছ ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে। অসুস্থতার কারণে এখন আর আগের মতো নিয়মিত মাছ ধরতে পারেন না তিনি। এক দিন মাছ ধরতে গেলে পরের দুই দিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। এ ছাড়া জলাশয়ে মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ধারদেনা ও অন্যের সহযোগিতা নিয়ে; এখনো দেড় লাখ টাকা ঋণ। মা দরদী রানী বলেন, ছোট মেয়েটার পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ, শত অভাবের মধ্যেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু এখন মেয়ের পড়াশোনা চালাব কী দিয়ে, তা বুঝতে পারছেন না তিনি। প্রধান শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, অভাব-কষ্ট পরিবারটির নিত্যসঙ্গী হলেও অষ্টমী থেমে যায়নি; সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষায় ভালো করবে সে। অষ্টমীর স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া এবং দরিদ্র মানুষের সেবা করা।

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার সালমা আক্তারের বাবা সফর আলী ছিলেন দিনমজুর। ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। এরপর দুই বছর বয়সী সালমাকে নিয়ে মা মমতাজ বেগম স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। সন্তানের ভরণপোষণে বাসাবাড়ি ও হোটেলে রান্নাবান্নার কাজ শুরু করেন। কষ্ট থাকলেও মেয়েকে লেখাপড়া শেখানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে সালমা প্রমাণ করেছে, মায়ের স্বপ্নপূরণের পথেই সে হাঁটছে। মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সালমা। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকার সময় একবার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়; এক শিক্ষকের সহায়তায় আবার পড়ালেখা শুরু করে। পরে স্কুলের শিক্ষকদের অনেক সহায়তা পেয়েছে; বিনা বেতনে পড়াশোনা করেছে এবং এসএসসির ফরম পূরণেও টাকা দিতে হয়নি। বাবার চেহারা মনে নেই উল্লেখ করে সালমা বলে, তার মা তার কাছে মা ও বাবা দুটোই; সে লেখাপড়া করে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হতে চায়। মা মমতাজ বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাসাবাড়ি ও হোটেলে রান্নাবান্নার কাজ করে দৈনিক ২০০ টাকা মজুরি পান; মেয়েকে কলেজে ভর্তি করে পড়াশোনার খরচ দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। অধ্যক্ষ বিজন কুমার তালুকদার বলেন, সালমা অত্যন্ত মেধাবী; প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে সে ভালো কিছু করবে বলে তাঁর বিশ্বাস।