সাতক্ষীরার শ্যামনগর সদর থেকে পূর্ব দিকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নকিপুর জমিদারবাড়ি। একসময়ের জৌলুশ আর ঐশ্বর্যের প্রতীক এই বিশাল প্রাসাদটি এখন কেবল ধ্বংসাবশেষের স্তূপ। তিনতলার এই প্রাসাদের কারুকাজ করা স্তম্ভ, খিলান আর দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে; বড় অংশ এখন আগাছা ও ঘাস দ্বারা আবৃত। এক সময় ২১২ ফুট দীর্ঘ এই ভবনের চারপাশ ছিল সুবিন্যস্ত, কিন্তু বর্তমানে এর পূর্ব পাশের দেয়ালগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধসে গেছে।
স্থাপনাটির সাথে যুক্ত ছিল একটি বড় পুকুর, পাকা ঘাট, জোড়া শিবমন্দির এবং একটি অষ্টকোনাকার দোতলা নহবতখানা। বর্তমানে শিবমন্দির দুটি মোটামুটি ভালো অবস্থায় থাকলেও নহবতখানার অধিকাংশ অংশই ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নয়ন হোসেনের মতে, গত এক দশকে যদি যথাযথ সংস্কার করা হতো, তবে এই এলাকাটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারত। বর্তমানে এই পরিত্যক্ত প্রাসাদের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছেন আনোয়ারা বেগম ও ফাতেমা বেগম নামের দুজন অসহায় নারী।
নকিপুর জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো সাথী খাতুন। তাঁদের এই গবেষণাপত্রটি চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কভিত্তিক ব্রুকলিন রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিশিং ইনস্টিটিউটের 'জার্নাল অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড আর্কিওলজি'তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৮৮৮ সালে প্রভাবশালী জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরী এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। যদিও স্থানীয়দের ধারণা এটি আরও প্রাচীন, তবে গবেষকরা একে উনিশ শতকের শেষ ভাগের ঔপনিবেশিক স্থাপত্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নকিপুর মৌজার প্রায় ২.৯২ একর জমির ওপর নির্মিত এই প্রাসাদে মোট ৩৯টি কক্ষ ছিল—নিচতলায় ১৭টি, দ্বিতীয় তলায় ১৭টি এবং তৃতীয় তলায় ৫টি। জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরী মুর্শিদাবাদ থেকে এসে এখানে বসতি গড়েন বলে ধারণা করা হয়। তিনি এলাকায় রাস্তা, খাল খনন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মতো জনহিতকর কাজ করেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত নকিপুর মাইনর স্কুলটিই বর্তমানে নকিপুর হরিচরণ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর হরিচরণ রায়ের বংশধররা আর্থিক সংকটে পড়েন। এরপর ১৯৭১ সালে পরিবারের শেষ উত্তরাধিকারীরা কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এবং লুটপাটের ফলে প্রাসাদের মূল্যবান সামগ্রী হারিয়ে যায় এবং স্থাপনাটি জীর্ণ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নহবতখানার মতো বিরল স্থাপত্যটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে রাজপরিবারের জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো।
গবেষক শহিদুল ইসলাম মনে করেন, এই স্থাপনাটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম সাতক্ষীরার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। এদিকে, স্থাপনাটি রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ জানিয়েছেন, নকিপুর জমিদারবাড়ি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এটি সংরক্ষণের জন্য ইতিমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুতই এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




