জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সানা তাকাইচির কর্মপদ্ধতি ও ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি তার সমর্থনের হার দ্রুত নিম্নমুখী হয়েছে। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি সাম্রাজ্যিক পরিবারের আইনে সংশোধন এনে পুরুষ-শুধু উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা দেশের একটি বড় অংশের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয়। দ্বিতীয়ত, বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে তিনি বিলম্ব করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই দুই নীতিগত সিদ্ধান্ত তার জনপ্রিয়তায় গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

তাকাইচি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন যে, তিনি প্রতি রাতে মাত্র শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমান। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ভারী দায়িত্বের পাশাপাশি গৃহস্থালির কাজের বোঝা তার ঘুমের সময়কে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসে তিনি সরকারি বাসভবনে—যা স্থানীয়ভাবে ‘কোতেই’ নামে পরিচিত—স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। ১৯২৯ সালে নির্মিত এই ইট ও পাথরের প্রাসাদটি একসময় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর মূল কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো; পরবর্তীকালে এর ঠিক পাশেই আধুনিক কার্যালয় নির্মিত হয়। তাকাইচির ভাষ্য, বাসভবনের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে যাতায়াতের সময় সম্পূর্ণ বাঁচে এবং কোনো জরুরি মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবে কাজে নামা সম্ভব হয়।

তিনি বাসভবনের অভ্যন্তরে অফিসের কার্যক্রম আরও জোরদার করেছেন। সেখানে তিনি দূর থেকে অথবা সরাসরি উপস্থিত থেকে কর্মীদের সঙ্গে সভা পরিচালনা করেন এবং অফিস সময়ের পরেও নিয়মিত কাজ চালিয়ে যান। বাড়িতে নথিপত্র নিয়েও পড়াশোনা করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আমার কাছে সরকারি বাসভবনও একটি কর্মস্থল।” কিন্তু এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। জাপানের প্রথম নারী নেতা হিসেবে তিনি কর্মজীবনের ভারসাম্য ও লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে একটি ভুল ও বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে গৃহস্থালির বোঝার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরে তিনি নারীদের দ্বৈত দায়িত্বের বিষয়টি সামনে এনেছেন; কিন্তু সেই সঙ্গে সমাধানের কোনো কার্যকর পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকে। ফলে তার এই বক্তব্য লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রায় নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে সমালোচকরা দাবি করছেন।

গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, তাকাইচি সম্প্রতি সংসদীয় অধিবেশন এড়িয়ে চলছেন এবং রাত ও ছুটির দিনে বেশিরভাগ সময় বাসভবনে কাটাচ্ছেন। পূর্বসূরিদের তুলনায় অন্যান্য আইনপ্রণেতা, দলীয় নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ও মতবিনিময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পরিবর্তে তিনি প্রায়শই এক্স-এ নিজের মন্তব্য ও নীতিগত অবস্থান প্রকাশ করেন। এই প্রবণতা তার প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, জনমতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এড়িয়ে চলার এই কৌশল তার সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

বাসভবনটির ইতিহাসও বেশ চাঞ্চল্যকর। ১৯৩০-এর দশকে এখানে দুটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় কিংবদন্তি ও লোককথা অনুসারে, ভবনটি ভূতের বসবাসের স্থান হিসেবে পরিচিত। তাকাইচি অবশ্য ভূতের কোনো অস্তিত্ব দেখেননি বলে জানিয়েছেন। তবে তেলাপোকার সঙ্গে তার অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা হয়েছে। তিনি হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, “আমি কখনো ভূত দেখিনি, কিন্তু তেলাপোকার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে অনেকবার চিৎকার করেছি।” একবার তার পায়ের কাছ দিয়ে একটি তেলাপোকা দৌড়ে চলে যাওয়ায় তিনি বিস্মিত ও ভীত হয়ে পড়েন বলেও জানান।

এই সব ঘটনা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বশৈলী, কর্মপদ্ধতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, কর্মদক্ষতার নামে ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ ও জনসংযোগের অভাব কোনো সরকারের দীর্ঘস্থায়ী সফলতার জন্য শুভ লক্ষণ নয়।