বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদাও আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। তবে আইরিশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশে ডেটা সেন্টারের নতুন সংযোগ সীমিত বা স্থগিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আয়ারল্যান্ডে দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ব্যবহার করে ডেটা সেন্টারগুলো, যার ফলে ডাবলিনের আশেপাশে নতুন গ্রিড সংযোগ তিন বছরের জন্য কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছিল। একইভাবে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে নিউইয়র্ক স্টেট নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশগত অনুমতির ক্ষেত্রে নতুন বড় ডেটা সেন্টারের জন্য এক বছরের স্থগিতাদেশ জারি করেছে, যাতে বিদ্যুৎ গ্রিড ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করা যায়।
রূশ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও জেনারেল পার্টনারের মতে, ডেটা সেন্টারের ওপর এই ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ করা একটি কৌশলগত ভুল। তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ গ্রিড সক্ষমতার সাথে তাল মেলাতে না পেরে নির্মাণ বন্ধ না করে বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ ও গ্রিডের পরিধি বাড়ানো উচিত। কারণ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এখন বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব দেশ নিজস্ব কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে পারবে না, তারা বিদেশি প্রোভাইডারদের মূল্যবৃদ্ধি বা শর্ত পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়বে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এই প্রতিযোগিতার একটি বড় উদাহরণ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের লড়াইয়ে। ওয়াশিংটন ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সরবরাহকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, বেইজিং তাদের 'ইস্টার্ন ডেটা, ওয়েস্টার্ন কম্পিউটিং' প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিম চীনে কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, যেখানে ভূমি ও জ্বালানির সহজলভ্যতা বেশি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে চীন প্রায় ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করেছে, যা বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধির ৬০ শতাংশের বেশি। ইউরোপের দেশগুলো বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ কাজ ধীরগতির, ফলে তারা মার্কিন ক্লাউড প্রোভাইডারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতির সমস্যাটি কেবল ডেটা সেন্টারের জন্য নয়, বরং সামগ্রিক চাহিদার সাথে যুক্ত। তবে সমস্যাটি হলো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এই চাহিদার তীব্র ঘনত্ব। বর্তমানে হার্ডওয়্যারের পরিবর্তনের কারণে বিদ্যুৎ খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এনভিডিয়ার GB200 ভিত্তিক সিস্টেমগুলোতে প্রতি র্যাকে ১২০-১৩২ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, যেখানে আগে তা ছিল মাত্র ৭-১২ কিলোওয়াট। এর ফলে সাধারণ এয়ার কুলিংয়ের পরিবর্তে এখন লিকুইড কুলিং সিস্টেমের প্রয়োজন হচ্ছে। এছাড়া ট্রান্সফর্মারের দীর্ঘ লিড টাইম এবং গ্যাস টারবাইন তৈরির কারখানায় দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। মাইক্রোসফটের সিইও সত্য ন ডেলা স্বীকার করেছেন যে, বিদ্যুতের অভাব এখন তাদের প্রধান সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় টেক জায়ান্টরা এখন নিজেরাই বিদ্যুৎ উৎস খুঁজছে। মাইক্রোসফট তাদের প্রয়োজনের জন্য 'থ্রি মাইল আইল্যান্ড' রিয়্যাক্টর থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে এবং গুগল ২০৩০ সালের মধ্যে স্মল মডুলার রিয়্যাক্টর চালু করার পরিকল্পনা করছে। তবে লেখক মনে করেন, কেবল করপোরেট উদ্যোগের ওপর ভরসা করা ঠিক হবে না। সরকারকে গ্রিড সম্প্রসারণ, ট্রান্সফর্মার উৎপাদন ত্বরান্বিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে সহায়তা করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে ইউক্রেনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের কারণে কেন্দ্রীয় গ্রিড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা দ্রুত স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
পরিশেষে, এআই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে কেবল উন্নত মডেল বা চিপ থাকলেই হবে না, বরং দ্রুত কম্পিউটিং সক্ষমতা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্রিড সম্প্রসারণের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাধা দিলে সাময়িকভাবে গ্রিডের চাপ কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা প্রযুক্তিগত পরনির্ভরশীলতাকে আরও গভীর করবে।




