বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত রূপান্তরের ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেননি বলে দাবি করেছে বৈশ্বিক সাংগঠনিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্ন ফেরি। প্রতিষ্ঠানটির 'ট্যালেন্ট ট্রেন্ডস ২০২৭' প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মাত্র ৬ শতাংশ উচ্চপদস্থ নেতা এবং বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে তাদের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব এখন এসে পড়েছে মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকদের কাঁধে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, ব্যবস্থাপকরা এখন তাদের দৈনন্দিন কাজের চেয়ে কর্মীদের এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করার পেছনেই বেশি সময় ব্যয় করছেন।

৭৫টিরও বেশি দেশের সিইও, সিএইচআরও এবং বোর্ড সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ১,৩০০ জনেরও বেশি নেতার ওপর ভিত্তি করে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র দক্ষ জনশক্তির অভাব নয়, বরং সক্ষমতার ঘাটতি (capability gaps) আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা। এছাড়া ৭৮ শতাংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে কাজ করার পদ্ধতি কেমন হবে সে বিষয়ে খুব কম সংখ্যক মানুষই প্রস্তুত।

কর্ন ফেরির সিনিয়র ক্লায়েন্ট পার্টনার ক্যাথি রিটেলম্যান এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকরা এখন প্রতিষ্ঠানের 'শক অ্যাবজর্বার' বা ধাক্কা সামলানোর যন্ত্রে পরিণত হয়েছেন। তাদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন এক অনিশ্চিত পথে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে গন্তব্য সম্পর্কে তাদের নিজেদেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উচ্চপদস্থ নির্বাহীদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো, যেগুলোতে ব্যবস্থাপকদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি, সেগুলোই তাদের কর্মীদের কাছে ব্যাখ্যা ও কার্যকর করতে হচ্ছে। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বের পরিকল্পনা পরিবর্তনের সাথে সাথে কর্মীদের পুনরায় কাজ করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে এবং মূল্যবান কর্মীদের চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

কর্ন ফেরির গ্লোবাল টেক মার্কেট এবং ক্লায়েন্ট এক্সপেরিয়েন্সের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সুসান ডি লা ভেগা জানান, এআই রূপান্তর মানে কেবল নতুন প্রযুক্তি চালু করা নয়, বরং পুরো জনশক্তি কাঠামোর পুনর্গঠন। তিনি মনে করেন, এই অনিশ্চয়তা কাটাতে শীর্ষ নেতাদেরই আগে এগিয়ে আসতে হবে এবং নিজে টুলসগুলো শিখে নিতে হবে। এছাড়া প্রতিটি পদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ এবং কর্মীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত কর্মীদের কাছে পৌঁছানোর আগেই ব্যবস্থাপকদের সেটির পেছনের যুক্তি জানানো উচিত, যাতে তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন।

এই অভাবের কথা কেবল কর্ন ফেরি নয়, গ্যালপ-এর এক সমীক্ষাতেও উঠে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ২৫ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন যে তাদের প্রতিষ্ঠানে এআই একীকরণের স্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যাদের প্রতিষ্ঠানে স্পষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপকের সক্রিয় সমর্থন রয়েছে, তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ বা এনগেজমেন্ট অনেক বেশি (৪৮ শতাংশ), যেখানে সমর্থনহীন কর্মীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ। পরিশেষে, ডি লা ভেগা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকদের দিয়ে এই ধাক্কা সামলানো সম্ভব হলেও, তাদের পেছনে একটি কার্যকর সিস্টেম থাকা জরুরি।