বর্তমান সময়ে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব স্পষ্ট। কর্মক্ষেত্র কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি এখন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা থেরাপির জগতেও প্রবেশ করেছে এই প্রযুক্তি। বিশেষ করে গভীর রাতে দুশ্চিন্তা বা মন খারাপের সময় তাৎক্ষণিক ও বিনামূল্যে পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকেই চ্যাটজিপিটির মতো এআই চ্যাটবটের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। তবে প্রথাগত মানসিক চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে এআই কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কভিত্তিক 'থেরাপিস্টস অব নিউ ইয়র্ক'-এর নিবন্ধিত মনোবিদ ডা. জিওফ্রে গোল্ড লক্ষ্য করেছেন যে, অনেক রোগী এখন তাদের নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের মধ্যবর্তী সময়ে নিজের ভাবনা যাচাই করতে এআই-কে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে এই প্রবণতা সব সময় ইতিবাচক নয়। চ্যাটবটের মাধ্যমে ক্ষতির অভিযোগে ইতিমধ্যে বেশ কিছু মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঝুঁকি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা ও ইলিনয় অঙ্গরাজ্য এআই-এর মাধ্যমে মানসিক চিকিৎসায় আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপের পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে, শিকাগোভিত্তিক মনোচিকিৎসক ও পডকাস্ট সঞ্চালক ডা. আদিয়া গুডেনের মতে, এআই-কে পুরোপুরি বাতিল না করে সীমিত ও সঠিক উপায়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যে এআই-এর কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। একজন পেশাদার থেরাপিস্টের সাথে দেখা করতে নির্দিষ্ট ফি দিতে হয় এবং তাদের সময় সীমিত থাকে। কিন্তু চ্যাটবট ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে উপলব্ধ। ডা. গোল্ডের মতে, রাত ২টোর মতো সময়ে যখন অস্থির চিন্তা বা বিব্রতকর অভিজ্ঞতার কারণে মন অশান্ত থাকে, তখন এটি একটি ভার্চুয়াল আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ডা. গুডেনের মতে, মানসিক সুস্থতার ছোটখাটো কৌশল শিখতে এআই কার্যকর। যেমন—অ্যাংজাইটি কমাতে পাঁচ মিনিটের শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য জার্নালিং-এর বিষয়বস্তু তৈরি করা। তবে বড় কোনো পারিবারিক সংকট বা পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআই-এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবিক স্পর্শের অভাবই এআই-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। থেরাপির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, যা কোনো যন্ত্রের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়। ডা. গোল্ড মনে করেন, স্ক্রিনের ওপাশে কোনো আবেগীয় সত্তা নেই। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর কথা বলার ধরন বা মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝতে পারেন যে রোগী ভেতরে ভেতরে কী কষ্ট লুকিয়ে রেখেছেন, যা চ্যাটবটের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। এছাড়া এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষকে বাস্তব জীবনের পরিবার ও বন্ধু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ডা. গুডেন। আরও একটি বড় সমস্যা হলো, চ্যাটবটগুলো সাধারণত ব্যবহারকারীর সাথে একমত হওয়ার প্রবণতা দেখায়, ফলে এটি ব্যবহারকারীর ভুল বা ক্ষতিকর চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করার পরিবর্তে তাকে প্রশ্রয় দিতে পারে। একজন প্রকৃত মনোবিজ্ঞানীর কাজ হলো সহমর্মিতার সাথে রোগীর ভুল চিন্তার পেছনের মূল কারণ যেমন—একাকিত্ব বা নিরাপত্তাহীনতা খুঁজে বের করা।
নিরাপদে এআই ব্যবহারের জন্য বিশেষজ্ঞরা চারটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। প্রথমত, প্রথাগত থেরাপির মতো এআই ব্যবহারের জন্যও একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে নেওয়া উচিত, যাতে মানুষ একই দুশ্চিন্তায় আটকে না থাকে। দ্বিতীয়ত, মানসিক সান্ত্বনার চেয়ে নেতিবাচক চিন্তা বদলানোর সুনির্দিষ্ট কৌশল খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। তৃতীয়ত, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা জরুরি; কারণ এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল তথ্য দিতে পারে। তাই তাকে তথ্যের উৎস বা রেফারেন্স উল্লেখ করতে বলা উচিত। চতুর্থত, আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদকাসক্তি বা দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর সংকটে কখনোই এআই-এর ওপর ভরসা না করে দ্রুত পেশাদার চিকিৎসক বা সাপোর্ট গ্রুপের সাহায্য নেওয়া আবশ্যক। মনে রাখতে হবে, পেশাদার থেরাপিস্টদের মতো এআই-এর ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার কোনো কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।




