ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন এক নাম আছে, যার উল্লেখ করলেই বোঝা যায় কার কথা হচ্ছে—ডন ব্র্যাডম্যান। আজ তাঁর ১১৮তম জন্মবার্ষিকী। ১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট এই দিনে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের বাউরালে জন্মেছিলেন তিনি। ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিসংখ্যানগুলো যেন তাঁর নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
টেস্ট ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং গড় ৯৯.৯৪। ৫২ টেস্টে তিনি সংগ্রহ করেছেন ৬,৯৯৬ রান, যার মধ্যে ২৯টি শতক। এর মধ্যে ১২টি ডাবল সেঞ্চুরি, দুটি ট্রিপল সেঞ্চুরি এবং একটি কোয়াড্রপল সেঞ্চুরিও আছে। মজার বিষয় হলো, ৩৩৮টি প্রথম শ্রেণির ইনিংসের ২২১টিতে তিনি সেঞ্চুরি করতে পারেননি। সেই ইনিংসগুলোতে তাঁর গড় ৫৮.২০, যা জ্যাক হবস, ওয়ালি হ্যামন্ড, গ্যারি সোবার্স, ভিভ রিচার্ডসদের মতো কিংবদন্তিদের সেঞ্চুরিসহ ব্যাটিং গড়ের চেয়েও বেশি।
১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম সফরে ব্র্যাডম্যানের রেকর্ডগুলো এখনো অমর। ৫ টেস্টের সিরিজে তিনি ৯৭৪ রান করেন। হেডিংলিতে এক দিনে ৩০৯ রান করে অপরাজিত ছিলেন, যা তখন টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোর। পরে ৩৩৪ রানে আউট হয়ে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। ইংল্যান্ড যাওয়ার আগে শেফিল্ড শিল্ডে তিনি ৪৫২ রান করেছিলেন, ফলে একই সময়ে টেস্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড দুটিই ছিল তাঁর দখলে। পরে ব্রায়ান লারা এই দুটি রেকর্ড একসাথে ধারণ করেছিলেন।
ব্র্যাডম্যানের এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পরই ইংল্যান্ড বডিলাইন বোলিংয়ের কৌশল গ্রহণ করে। হ্যারল্ড লারউডের নেতৃত্বে শরীর লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়। ১৯৩২-৩৩ সালের সেই সিরিজে ব্র্যাডম্যানের গড় নেমে আসে ৫৬.৫৭-তে, যা অন্য ব্যাটসম্যানদের জন্য গ্রেটনেসের স্বীকৃতি। তবে তিনি যে কতটা অসাধারণ ছিলেন, তা যুদ্ধ-পরবর্তী প্রত্যাবর্তনে আরও স্পষ্ট হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ক্যারিয়ারের সোনালি আট বছর হারান তিনি। ডাক্তারদের নিষেধ সত্ত্বেও ৩৮ বছর বয়সে ক্রিকেটে ফিরে আসেন, যুদ্ধের অন্ধকারে থাকা ক্রিকেট-বিশ্বকে আলোকিত করার দায়বোধ থেকে। আট বছর বিরতির পর শেষ তিনটি সিরিজে তাঁর গড় ছিল ৯৭.১৪, ১৭৮.৭৫ ও ৭২.৫৭। যুদ্ধের পর ১৫ টেস্টে তিনি ৮টি সেঞ্চুরি করেন। ইংলিশ কিংবদন্তি ডেনিস কম্পটন বলেছিলেন, 'ব্র্যাডম্যান এমন এক খেলোয়াড়, যিনি শুধু এক জীবনেই নয়, পুরো খেলার ইতিহাসে একবারই আসেন।'
শুধু ব্যাটসম্যানই নন, মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন বিরল। ভক্তদের প্রতিটি চিঠির উত্তর নিজ হাতে লিখতেন, অসুস্থতার আগপর্যন্ত। রোনাল্ড পেরি লেখা তাঁর জীবনীর পাণ্ডুলিপি ৮০টি পয়েন্ট নিয়ে সংশোধন করে দেন। সাত ঘণ্টার ইন্টারভিউতে তিনি একটিও অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বলেননি, যা পেরিকে বিস্মিত করেছিল। ১৯৩১ সালে ব্ল্যাকহিথে এক প্রীতি ম্যাচে মাত্র ২২ বলে সেঞ্চুরি করেন, যেখানে ১০টি ছক্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত ২৫৬ রানে আউট হন। তাঁর ব্যাটগুলো ছিল অত্যন্ত সাধারণ, তবুও তা দিয়ে বোলারদের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
২০০১ সালে ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হন ডন ব্র্যাডম্যান। তাঁর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বাউরাল জাদুঘরে সংরক্ষিত ব্যাটগুলো আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের বিস্মিত করে।



