দক্ষিণ এশিয়ার স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষে এখন এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জনসংখ্যাগত এই রূপান্তরের মুখে শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ব্লগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব লা প্লাতার গবেষক মারিয়ানা মারচিওন্নি, ইমানুয়েল হোসে ভাসকেজ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের অর্থনীতিবিদ মোনিকা ইয়ানেস পাগানস এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বলতে সাধারণভাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো অঞ্চলের মানুষের সংখ্যা, বয়স ও কাঠামোর পরিবর্তনকে বোঝায়। উচ্চ জন্ম ও মৃত্যুহার থেকে নিম্ন জন্ম ও মৃত্যুহারে উত্তরণের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া শিক্ষা খাতের পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং সেবা প্রদানের কৌশলকে সরাসরি প্রভাবিত করে। বর্তমানে সাব-সাহারা আফ্রিকার পর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ১৫ বছরের কম বয়সি শিশু বাস করে দক্ষিণ এশিয়ায়, তবে এই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে।

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা—এই ছয় দেশের স্কুলগামী তরুণদের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। গত দুই দশকে শিক্ষা সম্প্রসারণের ফলে অঞ্চলটির প্রায় সব শিশু এখন নির্ধারিত বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও একটি গভীর সমস্যা থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশে অর্ধেকের বেশি শিশু প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পরেও বয়সোপযোগী সাধারণ বাক্য পড়তে বা বুঝতে পারছে না। মূল সমস্যা হলো, শিশুদের স্কুলে আনার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া ব্যাপক সাফল্য পেলেও, শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের পর পর্যাপ্ত শেখার সুযোগ তারা পাচ্ছে না।

এই শিখন ঘাটতির পেছনে সীমিত সরকারি বিনিয়োগকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩.৭ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে, যা আন্তর্জাতিক প্রস্তাবিত ৪ থেকে ৬ শতাংশের চেয়ে কম। তবে চ্যালেঞ্জটি শুধু ব্যয়ের পরিমাণ নয়; বরং সম্পদ কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় এমন খাতে পরিচালিত হয়, যা শিক্ষার্থীদের শিখন ফলাফল উন্নত করতে তেমন ভূমিকা রাখে না।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের গবেষকদের মতে, স্কুলগামী শিশুর সংখ্যা হ্রাস পাওয়া দেশগুলোর জন্য এটি একটি নতুন সুযোগ। সঠিক খাতে ব্যয় করা হলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব, যাকে 'জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ' বলা হয়। তবে এই লভ্যাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না। শিক্ষা ব্যবস্থার স্থায়ী খরচ যেমন স্কুল ভবন, প্রশাসন ও পরিবহন নেটওয়ার্ক নিজে থেকে কমে না, তাই সংস্কার ছাড়া শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয় বৃদ্ধি করলেও শিখন দুর্বলতা কাটবে না। সরকারগুলোকে সক্রিয়ভাবে এই রূপান্তর পরিচালনা করতে হবে।

আর্থিক সুযোগ সব দেশে সমান গতিতে আসবে না। কোন দেশ জনসংখ্যাগত রূপান্তরের কোন পর্যায়ে আছে, কত শিশু স্কুলে ভর্তি হচ্ছে এবং শিক্ষার্থী প্রতি সরকারি ব্যয়ের হার কত—এই বিষয়গুলোর ওপর তা নির্ভর করবে। ভুটান ও মালদ্বীপ তাদের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে জিডিপির তুলনায় উচ্চতর শিক্ষা ব্যয় করতে সক্ষম হতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোকে উচ্চাভিলাষী গুণগত লক্ষ্য অর্জনে অতিরিক্ত সম্পদ খুঁজতে হবে। ভারত এমন একটি দেশ, যেখানে এই রূপান্তর শিক্ষায় পুনরায় বিনিয়োগের বড় সুযোগ তৈরি করছে। নেপালেও সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সেটি নির্ভর করবে শিশুদের স্কুলে ভর্তির ধারা ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর।

এই পরিস্থিতিতে সরকারগুলোর করণীয় সম্পর্কে নিবন্ধে তিনটি মূল পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, শিক্ষা বাজেট কমিয়ে না এনে জনসংখ্যাগত প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর খাতে পুনরায় বিনিয়োগ করতে হবে। উন্নত শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সঠিক স্তরে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের শিখনে মনোযোগ দেওয়ার মতো ক্ষেত্রগুলোতে ব্যয় বাড়ানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, স্কুল ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিকল্পনা আগে থেকেই করতে হবে। স্কুলগুলোকে কেবল বাজেটের খাত হিসেবে নয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হবে—যেখানে স্বচ্ছ যোগাযোগ, সামাজিক অংশগ্রহণ, নিরাপদ পরিবহন ও উন্নত সুবিধার মতো ব্যবহারিক সমাধান প্রয়োজন। তৃতীয়ত, দেশের নিজস্ব সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিভিন্ন গতিতে এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই একই নীতি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপের জন্য যা যৌক্তিক, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ বা ভারতের জন্য তা কার্যকর নাও হতে পারে। তবে এটি দেশগুলোর জন্য একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার একটি সুযোগও বটে।