চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সম্প্রতি শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস, যাকে অনেকেই আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিক হিসেবে অভিহিত করছেন। মানব অলিম্পিকের আদলে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় পদক তালিকার শীর্ষে থাকছে আয়োজক চীনের দলগুলোই। দেশটির দ্রুত বিকাশমান এই প্রযুক্তিখাতের ক্রমবিকাশের একটি জীবন্ত প্রতিচিত্র ফুটে উঠেছে এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পের সাফল্য যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের কাছেও কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে, তাও স্পষ্ট হয়েছে বিভিন্ন সময়ে তাঁর দেওয়া ভাষণ ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে।
শুরুর দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দল এবং শখের রোবট নির্মাতাদের হাত ধরেই চীনে রোবট প্রতিযোগিতার সূচনা হয়েছিল, যা ছিল অনেকটা বিজ্ঞান প্রকল্পের মতোই। তখনকার সেই ক্ষুদ্র পরিসরের আয়োজন এখন রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত একটি জাতীয় প্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি নিজেদের পণ্যের বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু প্রদর্শনীর গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, এসব প্রতিষ্ঠান এখানে প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছে যে তাদের উদ্ভাবিত পণ্য বাস্তব জীবনে কোন কাজে আসতে পারে।
১৯৯৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চীনের রোবোটিকস প্রতিযোগিতার যাত্রা শুরু হয়েছিল তুলনামূলকভাবে কম বাজেটের আয়োজনে। ফুজিয়ান প্রদেশের স্থানীয় সরকার ও একটি শিল্প সংগঠনের সহায়তায় এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিত মূলত কলেজ পর্যায়ের দলগুলো। ছোট চাকার রোবটগুলো তখন ফুটবলের একটি প্রতিযোগিতামূলক সংস্করণে অংশ নিত, যেখানে সংঘর্ষ এড়ানো এবং বল খুঁজে বের করার জন্য আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা সীমিত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল। ২০১৫ সালে বেইজিংয়ে প্রথম ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে রোবোটিকস খাত জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে ওঠে। এর এক বছর আগে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং রোবোটিকসকে উন্নত উৎপাদন শিল্পের 'মুকুটের রত্ন' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। সেই বছরের প্রদর্শনীতে চলনশীল রোবটগুলো ব্যাডমিন্টন খেলার একটি প্রদর্শনী দিয়েছিল, যেখানে রোবটগুলো শাটলকক অনুসরণ করে তা ফিরিয়ে দিচ্ছিল। তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে সেটি তেমন বড় অগ্রগতি ছিল না, কারণ সেগুলো ২০১০-এর দশকে তৈরি দূরত্ব ও ছবিভিত্তিক সেন্সরের পাশাপাশি ১৯৯০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গবেষকদের উদ্ভাবিত বস্তুর গতিপথ অনুমানের পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করত।
২০২৩ সালের মধ্যে ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর উদ্ভাবন প্রদর্শন এবং নিজেদের পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টির একটি বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। এই সময়ে রোবট তৈরিতে কম খরচের কারণে চীনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার বিষয়টিও সামনে আসতে থাকে। শাওমির তৈরি রোবট কুকুর 'সাইবারডগ' ছিল সেসময়ের অন্যতম আকর্ষণ, যার দাম ছিল মাত্র ১ হাজার ৫০০ ডলার; অথচ বোস্টন ডায়নামিকসের অনুরূপ চার পা-ওয়ালা রোবট 'স্পট'-এর দাম ছিল ৭৫ হাজার ডলারের বেশি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বেইজিংয়ে বিশ্বের প্রথম রোবট হাফ ম্যারাথনে অংশ নিয়ে হোঁচট খেয়েছিল অনেক রোবট। কেউ শুরুতেই পড়ে যায়, আবার কেউ কয়েক মিটার এগিয়ে রেলিংয়ে ধাক্কা খায়। প্রকৌশলীদের তৎপরতা সত্ত্বেও মাত্র কয়েকটি রোবট দৌড় শেষ করতে পেরেছিল। তবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। দ্বিতীয় বেইজিং হাফ ম্যারাথনে ইউনিট্রির 'এইচ১' রোবট কোনো মানুষের সহায়তা ছাড়াই ফিনিশিং লাইনের দিকে ছুটে যায়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ১০০টিরও বেশি রোবট দলের মধ্যে ৪৭টিই দৌড় সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
এবারের আসরের সবচেয়ে নজরকাড়া ঘটনা ছিল চীনের স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অনারের তৈরি 'ফ্ল্যাশ' নামের হিউম্যানয়েড রোবটের পারফরম্যান্স। রোবটটি নিজে নিজেই ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হাফ ম্যারাথন শেষ করে, যা মানুষের করা বিশ্ব রেকর্ডের চেয়ে প্রায় ৭ মিনিট কম। বিশ্লেষক ও প্রযুক্তিখাতের নির্বাহীদের মতে, সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়া এবং সরকারি ভর্তুকির কারণে রোবট তৈরির উপকরণের দাম কমে যাওয়ায় এই দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। এই উন্নয়নের পেছনে সরকারের সরাসরি ভূমিকাও ছিল; ২০২১ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় রোবোটিকস খাতে ভর্তুকি, গবেষণায় করছাড় ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বেইজিং, যার লক্ষ্য ছিল চীনকে 'রোবোটিকস প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বৈশ্বিক উৎস' হিসেবে গড়ে তোলা। ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে নতুন করে যুক্ত হয়েছে রোবটের হাতের দক্ষতা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতা, যেখানে স্ক্রু শক্ত করে লাগানো, বোতল খোলা এবং চিমটি দিয়ে ছোট ছোট পুঁতি তোলার মতো কাজ কতটা দ্রুত ও নিখুঁতভাবে করা যায় তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের মতো নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে এমন হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির ক্ষেত্রে হাত তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত বাড়তে থাকা এই খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তৈরি প্রোটোটাইপগুলো বাস্তব জীবনেও কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে তা প্রমাণ করা, তাই গেমসে কাজভিত্তিক এসব প্রতিযোগিতা যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া গত শনিবার চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, অনারের তৈরি 'লাইটনিং' নামের আরেকটি হিউম্যানয়েড রোবট ১০০ মিটার দৌড়েছে ৯ দশমিক ৩২ সেকেন্ডে, যা ২০০৯ সালে বার্লিনে উসাইন বোল্টের করা ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস শুরুর দিন প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষায় এই কৃতিত্ব দেখায় রোবটটি।




