নিউজিল্যান্ডে ধর্মীয় গোষ্ঠীর এক নেতাকে তার বয়স্ক চীনা অনুসারীর মৃত্যুর জন্য দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির আদালত। হত্যা ও অপহরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কাইক্সিয়াও লিউ নামের ওই ব্যক্তির ১০ বছরের বেশি কারাবাসের আদেশ দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে অকল্যান্ডের গালফ হারবার এলাকার কাছে ধানভর্তি বস্তায় মোড়ানো অবস্থায় ৭০ বছর বয়সী শুলাই ওয়াংয়ের মরদেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়, যার পরিণতিতে লিউয়ের নাম উঠে আসে।

চীনের একটি প্রতিভা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এই সংগীতশিল্পী নিজেকে কোনো ধর্মীয় গুরু নন বলে দাবি করে আসছিলেন। তার মতে, সংগীতের মাধ্যমেই তিনি অনুসারীদের আকৃষ্ট করেছিলেন। বিচার চলাকালে আদালতে জানানো হয়, ২০২৩ সালের আগস্টে চীনের হাইনান দ্বীপ থেকে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি দেন ওয়াং। এরপর তিনি লিউ ও তার পরিবারের বাড়িতে উঠেন, যাকে লিউ নিজে 'দ্য আর্ক' নামে অভিহিত করতেন। সেখানে আরও কয়েকজন নারী অনুসারী ছিলেন।

অভিযোগে বলা হয়, ওই নারীরা লিউ ও তার পরিবারের 'সেবায়' নিয়োজিত ছিলেন এবং লিউ তাদের জীবন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা তাকে 'প্রভু' বা 'গুরু' বলে সম্বোধন করতেন। জানা যায়, ওয়াং তার দিনগুলি লিউয়ের সন্তানদের দেখাশোনা, ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্য�়ন এবং সবজি চাষে কাটাতেন।

বয়সের কারণে লিউর কঠোর নিয়ম মেনে চলতে সমস্যা হচ্ছিল ওয়াংয়ের, ফলে প্রায়ই শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো তাকে। ২০২৪ সালের মার্চে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ধরে ফেলা হয় এবং আটকে রাখা হয়। আদালত জানায়, ওই দিনই তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর লিউ, তার পরিবারের সদস্য এবং অনুসারীরা মিলে গালফ হারবারের একটি মেরিনার কাছে ওয়াংয়ের মরদেহ ফেলে যায়। এই কাজে 'ছদ্মবেশ' হিসেবে নিজের সন্তানদেরও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন লিউ। কয়েকদিন পর এক জেলের জালে ধরা পড়ে মরদেহটি। তদন্তে দেখা যায়, মরদেহ মোড়ানো চালের বস্তাগুলো লিউই কিনেছিলেন, কারণ ওই ব্র্যান্ডের চাল তিনি অস্বাভাবিক পরিমাণে কেনেন।

লিউয়ের স্ত্রী লানিউয়ে শিয়াওকে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে প্রায় ৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার বাবা-মা জিনগুই লিউ এবং শিউয়ুন লি অপহরণ ও মরদেহের সঙ্গে অসদাচরণের দায়ে ইতোমধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন; তাদের সাজা ঘোষণা হবে বছরের শেষ দিকে।

রেডিও নিউজিল্যান্ডের খবরে বলা হয়েছে, রায় ঘোষণার সময় লিউয়ের আইনজীবী হালকা সাজার আবেদন জানিয়ে বলেন, তার মক্কেল অনুতপ্ত এবং তিনি কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতা নন, কাউকে তার অনুসারী হতে বাধ্যও করেননি।

নিউজিল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, লিউ চীনের একটি সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ২০১১ সালে 'চায়না'স গট ট্যালেন্ট'-এ অংশ নিয়েছিলেন তিনি; অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় গান গাইতে দেখা যায়। ২০১৭ সালে স্ত্রীকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি এবং সেখানেই স্থায়ী বাসিন্দা হন।

চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় আলোচনা, ভিডিও ডায়েরি এবং নিজের গানের ভিডিও পোস্ট করে অনুসারী তৈরি করতেন লিউ। এছাড়া 'ইউনিভার্সাল কোয়ার' নামে একটি প্রকল্পও চালু করেছিলেন তিনি, যা মহাজাগতিক থিমের অর্কেস্ট্রাল সংগীত তৈরি করত।

বিচার চলাকালে লিউর এক নারী অনুসারীর সঙ্গে কথা বলা এক পুলিশ কর্মকর্তার সাক্ষ্য দেওয়া হয়। আদালতে তিনি জানান, ওই নারী তাকে বলেছিলেন যে তিনি একটি গানের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেটে লোকজনদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন এবং বাড়ির বাসিন্দাদের বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক ম্যাথিউ ডাউনস বলেন, ওয়াংয়ের প্রতি লিউ 'নিষ্ঠুর উদাসীনতা' দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আপনার কারণে ওয়াং একাকী ও ভীতিকর মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনি কোনো অনুশোচনাই দেখাননি। আপনার লজ্জিত হওয়া উচিত।'