কুয়ালালামপুরের আলোকোজ্জ্বল বুকিত বিনতাং এলাকায় অবস্থিত 'বুকিত বিনতাং সিটি সেন্টার' (বিবিসিসি) আজ আধুনিক নগরজীবনের এক অনন্য উদাহরণ। কিন্তু এই চাকচিক্যময় স্থাপনার ইতিহাস অন্ধকারে ভরা। ১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার এখানে নির্মাণ করে মালয়েশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ কারাগার 'পুডু জেল'। পুডু এলাকার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল, যেখানে 'পিনজারা' শব্দের অর্থ জেলখানা। শুরুর দিকে স্বল্পমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের রাখা হলেও পরে মাদক পাচারকারী ও খুনিরা এখানে আসতে শুরু করে। কারাগারটির ভেতরে ছিল সবজি বাগান, যা বন্দীদের খাদ্যের যোগান দিত, ফলে কারাগারটি ছিল অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করা হতো 'ব্লক ডি'-এর ফাঁসিকক্ষে, আর বেত দিয়ে শারীরিক শাস্তিও দেওয়া হতো কারাগার চত্বরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জাপানি বাহিনী এই কারাগারটি যুদ্ধবন্দী শিবির হিসেবে ব্যবহার করে। পরবর্তীতে বেশিরভাগ বন্দীকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৪২ সালের মাঝামাঝিতে পুডু জেলে এক হাজারের বেশি যুদ্ধবন্দী ছিল বলে জানা যায়। ১৯৮৬ সালে জিমি চুয়া চাপ সেং-এর নেতৃত্বে একদল বন্দী ছয় দিন ধরে দুই কর্মীকে জিম্মি করে রাখে, যদিও পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে। ১৯৫৭ সালে মালয়েশিয়া স্বাধীন হওয়ার পর কুয়ালালামপুর দেশের রাজধানী হিসেবে বিকশিত হতে থাকে। আশির ও নব্বইয়ের দশকে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে দ্রুত উন্নতির সময় কারাগারটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বুকিত বিনতাংয়ের মতো বাণিজ্যিক এলাকার কাছে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পুরনো নকশার কারণে ১০১ বছর পর ১৯৯৬ সালে কারাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বন্ধ হওয়ার পর কারাগারটি কিছুদিন আদালতের শুনানিতে অংশ নেওয়া বন্দীদের দিবা-আবাসন কেন্দ্র এবং অল্প সময়ের জন্য জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০০৯ সালে সরকার কারাগার কমপ্লেক্সটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। তখনকার উপ-অর্থমন্ত্রী আওয়াং আদেক হুসেন ভবনটি সংরক্ষণের প্রশ্নে মন্তব্য করেন যে এটি গর্ব করার মতো কিছু নয়। ঐতিহাসিক এই স্থাপনার কিছু অংশ রক্ষার দাবিতে সংরক্ষণবিদদের আন্দোলনের পর সরকার বাইরের দেয়ালের একটি অংশ ও প্রধান ফটকটি রেখে দিতে সম্মত হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভেতরের সব ভবন ভেঙে ফেলা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ মিৎসুই লালাপোর্ট মলের ফোয়ারা পার্কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কারাগার নির্মাণের আগে এই জায়গাটি ছিল চীনা কবরস্থান ও ঘন জঙ্গল, যেখানে মালয় বাঘের বসবাস ছিল। কবরস্থানের দেহাবশেষ স্থানান্তর করে সেখানে কারাগারটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
অতীতের সেই অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে ২০২২ সালে এখানে চালু হয় বিবিসিসি। জাপানি প্রতিষ্ঠান মিৎসুই লালাপোর্টের এই প্রকল্পে রয়েছে আবাসিক হোটেল, অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস ভবন, বিশাল শপিং মল, পার্ক, ফোয়ারা, ফুটসাল কোর্ট, নানা দেশের রেস্তোরাঁ, লাইব্রেরিসহ নাগরিক জীবনের সব আয়োজন। শহরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সঙ্গে এখানকার সংযোগ চমৎকার। বিবিসিসি থেকে সরাসরি এলআরটি ও মনোরেল স্টেশনে যাওয়া যায়, ফলে বৃষ্টিতেও ভিজতে হয় না। মনোরেলে করে বুকিত বিনতাং থেকে টাইমস স্কয়ার, চুংগাই ওয়াং মার্কেট, লট১০, ফারেনহাইট এবং প্যাভিলিয়ন শপিং মল হয়ে কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টার ও পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার পর্যন্ত যাওয়া যায়। শহরের এই নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ ব্যবস্থা প্রবাসী লেখকের কাছেও প্রশংসনীয়। বিবিসিসির পার্কে বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় বসে লেখক পর্যবেক্ষণ করেন এই শহরের মুক্ত ও সভ্য পরিবেশ, যেখানে তরুণ-তরুণীরা স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদের কাজ করে যেতে পারে। তবে লেখকের ভাষায়, এই রঙিন শহর তার নয়, তিনি এখানে কেবল প্রবাসী।




