সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট সদস্য বুধ গ্রহের আকার যে ধীরে ধীরে কমছে, তা আগেই জানা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দাবি করা হচ্ছে, এই সংকোচনের হার আগের অনুমানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষকদের মতে, গ্রহটি এখন পর্যন্ত যতটা সঙ্কুচিত হয়েছে, তা পূর্ববর্তী হিসাবের তুলনায় ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত দ্রুততর হতে পারে।

বুধের বর্তমান ব্যাস প্রায় ১ হাজার ৫১৬ মাইল। নতুন হিসাব অনুযায়ী, সৃষ্টির পর থেকে এর ব্যাস সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৫ মাইল পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে, যা মোট ব্যাসের প্রায় ১ শতাংশ। যদিও এই সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বড় নয়, কিন্তু গ্রহের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে সৌরজগৎ গঠনের সময় বুধ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। সেই যুগে গ্রহগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল, যার মধ্য দিয়ে এগুলোর জন্ম হয়। সময়ের সঙ্গে বুধের ধাতব কেন্দ্র ঠান্ডা হতে থাকে, ফলে কেন্দ্র সংকুচিত হয় এবং পুরো গ্রহের উপর তার প্রভাব পড়ে। শুকিয়ে যাওয়া ফলের খোসার মতো বুধের পাথুরে ভূত্বকে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ভাঁজ, উঁচু-নিচু রেখা এবং খাঁজ।

জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টারের ইনস্টিটিউট অব স্পেস রিসার্চের গ্রহবিজ্ঞানী গাকু নিশিয়ামা ও তার সহকর্মীরা এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল 'জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স'-এ। গবেষণার জন্য তারা নাসার মেসেঞ্জার মহাকাশযানের তোলা ছবি বিশ্লেষণ করেছেন। ২০০৪ সালে মেসেঞ্জার বুধের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় পৃষ্ঠের অসংখ্য ছবি তুলেছিল। সেই ছবিগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক কালে তৈরি ত্রিমাত্রিক পৃষ্ঠতলের মডেল যুক্ত করে গবেষকেরা গ্রহের ভাঁজ, খাঁজ ও দীর্ঘ রেখাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কারণ, বুধ সংকুচিত হওয়ার সময় যে ভাঁজগুলো তৈরি হয়, সেগুলোই সংকোচনের পরিমাণ সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সরবরাহ করে।

তবে এই হিসাব করা মোটেও সহজ কাজ নয়। বুধের পৃষ্ঠের প্রতিটি অঞ্চলের স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। কোথাও লাভার প্রবাহ প্রাচীন ভূ-গঠনকে ঢেকে দিয়েছে, আবার কোথাও গ্রহাণুর আঘাতে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে পৃষ্ঠের প্রকৃত চেহারা বোঝা প্রায়ই দুরূহ হয়ে ওঠে। পৃথিবী থেকে বুধের দূরত্ব প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ মাইল, তাই দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেও সবকিছু বোঝা সম্ভব হয় না।

গবেষকেরা বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের উপর নির্ভর করে এই অনুমান করেছেন, তাই এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে বুধ ঠিক কতটুকু সংকুচিত হয়েছে। তবুও নতুন এই হিসাব বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। বুধের সংকোচনের গতি জানা গেলে বোঝা যাবে গ্রহটি কত দ্রুত ঠান্ডা হচ্ছে, তার প্রাথমিক আকার কত ছিল এবং ভেতরে কী ধরনের উপাদান রয়েছে।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী স্যাম বার্চ বলেন, প্রতিটি গ্রহেরই নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। বুধ কত দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে তা অনুধাবন করতে পারলে সেই ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হবে। শুধু বুধই নয়, এই গবেষণা পদ্ধতি অন্য পাথুরে মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। মঙ্গল ও চাঁদের মতো বস্তুগুলোও ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে, এবং বুধের ভাঁজ বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে সেগুলোর পরিবর্তন আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করবেন বিজ্ঞানীরা।

এদিকে এই গবেষণার পরিধি আরও প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ও জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যৌথ মিশন বেপিকলম্বো শিগগিরই বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এটি হবে বুধের কক্ষপথে যাওয়া দ্বিতীয় মহাকাশ অভিযান। এই মিশন গ্রহটিকে অনেক কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তৈরি করবে, ফলে পৃষ্ঠের গঠন ও সংকোচন সম্পর্কে আরও নিখুঁত তথ্য পাওয়া যাবে। তখন হয়তো বিজ্ঞানীরা নির্ভুলভাবে বলতে পারবেন, বুধের সংকোচনের হার প্রকৃতপক্ষে ১০ শতাংশ নাকি ৩০ শতাংশ বেশি।