চড়ুইয়ের চেয়ে সামান্য বড় আকারের শীতকালীন অতিথি পাখি জলপাই-পিঠ তুলিকার বৈজ্ঞানিক নাম Anthus hodgsoni। Motacillidae গোত্রের এই পাখিটি বাংলাদেশসহ উত্তর, মধ্য ও পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর-পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে একে মুচাসী নামেও ডাকা হয়। দেহের দৈর্ঘ্য ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ২১ থেকে ২২ গ্রাম। দেহের ওপরের অংশ কালচে ছিটছোপসহ জলপাই-সবুজ রঙের, ডানার পালকের প্রান্ত উজ্জ্বল জলপাই-সোনালি। ভ্রুর সামনের অংশ ঘিয়ে-হলদেটে, পেছনটা সাদাটে। ডানায় দুটি সাদা পট্টি, বুক-পেটে মোটা মোটা কালচে দাগ। লেজের বাইরের পালক সাদাটে, ঠোঁট ধূসরাভ-হলুদ এবং পা, আঙুল ও নখ গোলাপি বর্ণের। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারা প্রায় একই রকম।
বন্য প্রাণীপ্রেমী আদনান আজাদ ও ফারজানা রিক্তার অনুরোধে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান ২০২০ সালের ১৮ জানুয়ারি সকালে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে অবস্থিত আকিজ রেপটাইলস ফার্মে যান। সেখানে কৃত্রিম কুমিরশালার পাশে বরইগাছের ডালে ও পরে বিদ্যুতের তারে বসা একটি জলপাই-পিঠ তুলিকার ছবি তোলার সুযোগ পান। রোদেলা সকালে আলো ছিল অসাধারণ, তাই দ্রুত কয়েকটি ক্লিক করেন। তবে অতি চঞ্চল পাখিটি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেনি। এর আগে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আমলকীবাগানে প্রথম এই প্রজাতির ছবি তুলেছিলেন তিনি।
দেশজুড়ে গাছপালাসম্পন্ন এলাকায় এই পাখির দেখা মেলে। ছায়াঢাকা কাষ্ঠল জঙ্গল, ফলের বাগান, বাঁশঝাড়, গ্রামের পথঘাট ও মাঠের ধারে ছোট দলে কিংবা একাকী বিচরণ করতে দেখা যায়। হাঁটার সময় লেজ ওপর-নিচে দোলাতে থাকে, বিরক্ত হলে গাছে উঠে পড়ে। মূলত মাটিতে পাতার সারার মধ্যে খাবার খোঁজে। কীটপতঙ্গ, শূককীট এবং ঘাস ও আগাছার বীজ তার প্রধান খাদ্য। ডাক সাধারণত 'ট্সিট্' বা 'টি টি টি-টিরিচি-টিচি-চিক্-চিক্-চিক্' ধরনের।
প্রজননকাল মে থেকে আগস্ট। এ সময় মূল আবাস এলাকার শীতল, বনভূমিপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চলে বাসা বাঁধে। মাটিতে পাথর বা গাছের নিচে অগভীর খোঁদলে ছোট কাপ আকৃতির বাসা তৈরি করে স্ত্রী পাখি। ৩ থেকে ৫টি বেগুনি-বাদামি ঘন ছিটছোপসহ গাঢ় বাদামি ডিম পাড়ে, ডিম ফোটে ১২-১৩ দিনে। বাসা তৈরি ও ডিমে তা দেওয়ার কাজ স্ত্রী নিজেই করে, তবে ছানা লালন-পালনে স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই অংশ নেয়। ছানারা প্রায় ১১-১২ দিনে উড়তে শেখে। সাধারণত প্রতি প্রজনন মৌসুমে দুবার ডিম-ছানা তোলে এবং আয়ুষ্কাল ২ থেকে ৫ বছর।




