যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি বিশাল তেঁতুলগাছ। স্থানীয়দের কাছে এগুলো শুধু প্রাচীন বৃক্ষ নয়, বরং সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন বিকেলে বয়োজ্যেষ্ঠদের গল্পের আসর, তরুণদের আড্ডা—সবকিছুই জমে ওঠে এই গাছের তলায়। গাছগুলোর নিচে বসার জন্য বেঞ্চ রয়েছে, আর পাখির বিষ্ঠা থেকে রক্ষা পেতে উপরে টিনের ছাউনিও দেওয়া হয়েছে।
যশোর শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই গ্রাম। মুক্তাদাহ থেকে জগদীশপুর মিয়াবাড়ি পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে আম, কাঁঠাল ও লিচুর বাগান। প্রকৃতির নিবিড় পরিবেশে ঘেরা এই এলাকায় গাছগুলোর উপস্থিতি যেন আরও মহিমান্বিত।
গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে দেখা গেল ৯২ বছরের সরোয়ার হাওলাদারকে। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, জন্মের পর থেকেই এই গাছগুলো একই রকম দেখে আসছেন। বন্ধুদের সঙ্গে তেঁতুল পেড়ে খেজুরের গুড়ে ভিজিয়ে খাওয়ার কথা মনে পড়ে তাঁর। এখন প্রতিদিন দুপুরে তিনি এখানে এসে বসেন, গল্প করেন।
পাশেই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যার সামনে আরেকটি প্রাচীন তেঁতুলগাছ। সেখানে চায়ের দোকান থাকায় মানুষ চা পান করতে করতে আড্ডা দেন। প্রায় ৩০০ মিটার দূরে তৃতীয় আরেকটি বড় তেঁতুলগাছ রয়েছে।
৭০ বছরের ওলিয়ার রহমান জানান, গাছটির বয়স ঠিক কত তা কেউ জানে না। তবে গত বছর একটিমাত্র গাছ থেকে ৪০ থেকে ৫০ মণ তেঁতুল পাওয়া গেছে। এই গাছের মালিক কেউ নন, গ্রামের যে কেউ ফল পাড়তে পারেন।
জগদীশপুর গ্রামের নামকরণ প্রসঙ্গে ৮০ বছরের শের আলী জানান, প্রায় সাড়ে ছয় শ বছর আগে বুড়ি ভৈরব নদের চরে জগদীশ ঘোষ নামের এক ব্যক্তি বসতি স্থাপন করেন। সেই থেকেই গ্রামের নাম জগদীশপুর। মিয়াবাড়ির সামনে জমিদার ভবনের ফটকটি এখনো বিদ্যমান, যেখানে লেখা রয়েছে—'জমিদার ভবন, মিয়াবাড়ি-জগদীশপুর এস্টেট, স্থাপিত ১৩১৪ বঙ্গাব্দ (১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ)'। চুন-সুরকিতে নির্মিত ভবনের একাংশ এখনও টিকে আছে।
মিয়াবাড়ির সদস্য আ ন ম মোস্তাদুদ দস্তগীর জানান, অতীতে এক ইতালীয় উদ্ভিদবিশেষজ্ঞ এসে কার্বন পরীক্ষার মাধ্যমে গাছগুলোর বয়স ৬৩০ বছর বলে নির্ধারণ করেছিলেন। কালের বিবর্তনে ডালপালায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও গাছগুলো আজও সবুজ-শ্যামল।
এই তেঁতুলগাছগুলো এখন জগদীশপুরের মানুষের মিলনস্থল, ঐতিহ্যের প্রতীক। পাতার মর্মর শব্দে যেন শোনা যায় শতাব্দীর পুরোনো গল্প।




