ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হয়েও, ২৫ অক্টোবরের চূড়ান্ত রান-অফ নির্বাচনে লুলার এই প্রত্যাবর্তন ছিল চমকপ্রদ। শেষ পর্যন্ত তিনি ৩.৫ শতাংশের বেশি ভোট ব্যবধানে জয়ী হন, যা প্রায় ৪০ লাখ অতিরিক্ত ভোটের সমান। প্রথম দফার পরাজয়ের পর যখন অনেক বিশ্লেষক তাঁর জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শেষ বলে ধরে নিয়েছিলেন, তখনই তিনি প্রথম ব্রাজিলীয় প্রার্থী হিসেবে এই অনন্য রেকর্ড গড়লেন।

এই নির্বাচনী লড়াইটি ছিল মূলত দুটি বিপরীতমুখী জীবনদর্শনের সংঘাত। লুলার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল তীব্র আয় বৈষম্য দূর করা, পরিবেশ রক্ষা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির রূপান্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি একদিকে যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছেন, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের বিপরীতে ব্রাজিলীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন। বিপরীতে, ফ্লাভিও বলসোনারো সরকারি ব্যয় হ্রাস, পুলিশি শক্তিকরণ এবং মাদকবিরোধী লড়াইয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্রাজিলের খনিজ সম্পদের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন তিনি।

লুলার এই জয়ের পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলের ভূমিকা ছিল অনন্য। আগে ডানপন্থীদের আধিপত্য ছিল অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে, যা ২০১৮ ও ২০২২ সালে জাইর বলসোনারোর উত্থানে সাহায্য করেছিল। তবে এবারের লড়াইয়ে লুলার পক্ষে একদল তরুণ ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ যোগাযোগকর্মী হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইনস্টাগ্রামে অত্যন্ত কার্যকর ও আকর্ষণীয় ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার চালান। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো 'লুলার আর্মি' (Lula’s Army) নামক একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল, যার সদস্য সংখ্যা ৫ অক্টোবর থেকে নির্বাচনের রাত পর্যন্ত ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ১০ মিলিয়নে পৌঁছেছে। এছাড়া মিনা গেরেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে লুলার প্রভাব বৃদ্ধি পায়, যেখানে প্রায় ৭ লাখ ভোটের পরিবর্তন ঘটে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলে রাজনীতির 'আমেরিকানাইজেশন' বা মার্কিন ধাঁচের মেরুকরণ দেখা গেলেও, সাধারণ মানুষ এখনো স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পেনশনের মতো সামাজিক অধিকারের জন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এই মৌলিক বিশ্বাসটিই সম্ভবত লুলার জয় নিশ্চিত করেছে, যা আর্জেন্টিনার জাভিয়ের মিলেইয়ের মতো ডানপন্থী পপুলিজমের ঢেউকে বাধা দিয়েছে।

তবে জয়ের পরেও লুলার সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ২০২৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যখন নতুন কংগ্রেস শুরু হবে, তখন দেখা যাবে সেখানে লিবারেল পার্টির (ডানপন্থী) ব্যাপক আধিপত্য। সিনেটে ৩৫% এবং নিম্নকক্ষে ২৪% আসন তাদের দখলে থাকবে, যা বাজেট এবং আইন প্রণয়নে লুলার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া ৮১ বছর বয়সী লুলার শাসন ক্ষমতা পরিচালনা, চরমভাবে মেরুকৃত সুপ্রিম কোর্টের সাথে সমন্বয় এবং জিডিপির প্রায় ৮% বর্তমান রাজকোষ ঘাটতি কমানোর চাপ তাঁকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। একইসাথে, ট্রাম্প প্রশাসন তাঁর এই জয়ের পর কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং বলসোনারোর পরাজয় মেনে না নেওয়ার প্রচেষ্টায় তারা কোনো ভূমিকা নেবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। তবে ব্রাজিলের বিরল খনিজ সম্পদের মজুদ লুলার হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে।