বিশ্বজুড়ে খেলনার বাজার এখন ১২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের এক বিশাল ক্ষেত্র। এই বিপুল বাজারে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান; গত বছর তারা ৩ হাজার ৪৮২ কোটি ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারে। যদিও গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব অত্যন্ত নগণ্য।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং ইউএন কমট্রেড ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে ৪১টি দেশে খেলনা রপ্তানি করছে, যার মধ্যে ইতালিতে সবচেয়ে বেশি ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পণ্য পাঠানো হয়েছে। এছাড়া চীন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতেও বাংলাদেশি খেলনা পৌঁছাচ্ছে। তবে রপ্তানি তালিকার শীর্ষে থাকা চীন, চেক রিপাবলিক, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পেছনে।

দেশের খেলনা শিল্পে বর্তমানে ২৫টি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি কার্যক্রম চালাচ্ছে, যার মধ্যে মূল রপ্তানিকারক মাত্র ১৩-১৪টি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শীর্ষ পাঁচটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানই বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, হংকংভিত্তিক সনিক (বাংলাদেশ) লিমিটেড গত অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ২১ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। এছাড়া উইন চ্যাম্পিয়ন এবং বিপি ম্যানুফ্যাকচারিং—এই দুটি প্রতিষ্ঠানও সনিক গ্রুপের সহযোগী হিসেবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছে। জার্মান-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত কাপকেক এক্সপোর্টস এবং চীনা বিনিয়োগের মেইগো (বাংলাদেশ) লিমিটেডও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি করছে।

দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এবং আমান প্লাস্টিক টয় ইন্ডাস্ট্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে তারা বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং এই খাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাব রয়েছে। এছাড়া মানোন্নয়নের জন্য কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদী লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আমান প্লাস্টিক টয় ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারীর মতে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে উৎপাদিত পণ্যের ১ থেকে ১৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা চীনের ক্ষেত্রে মাত্র ১ শতাংশ।

খেলনা শিল্পকে মূলত ধাতু, কাঠ, প্লাস্টিক এবং কাপড়—এই চার ভাগে ভাগ করা যায়। আন্তর্জাতিক খেলনা সংস্থা 'দ্য টয় অ্যাসোসিয়েশন' জানিয়েছে, ২০২৩ সালে ১১০.৮ বিলিয়ন ডলারের খেলনা বিক্রি হয়েছিল, যা পরের বছর প্রায় ৭.৮৭ শতাংশ বেড়ে ১২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। শিশুদের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও খেলনার চাহিদা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তৈরি পোশাক শিল্পের মতো খেলনা শিল্পেও ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান বজায় রেখে পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। সরকার যদি বন্ড সুবিধা প্রদান এবং একটি পূর্ণাঙ্গ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তবে এই খাত থেকে বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে।