দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং জ্বালানি খাতের সংকট কাটিয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে অন্তত দুই বছর সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত 'বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি' শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা জানান। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, রাতারাতি সমস্যার সমাধান করে জনগণকে ভুল আশা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই বছরে জ্বালানি খাতসহ পুরো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা হবে, তৃতীয় বছরে গতি ফিরবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরের মধ্যে অর্থনীতি পূর্ণমাত্রায় ঘুরে দাঁড়াবে।

বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হওয়ায় দেশ জ্বালানিসংকটে পড়ে, যার সাথে যুক্ত হয়েছে পূর্ববর্তী আমলের বিপুল পরিমাণ দেনা ও দায়। তিনি স্বীকার করেন যে, বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেক বেশি এবং ব্যবসা সহজলভ্যতার সূচক নিম্নমুখী। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতি শিথিল করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি আলাদা সংস্থায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার একটি নীতিমালা তৈরি করবে এবং অন্যটি তা বাস্তবায়ন করবে।

জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত এক বা দেড় দশক ধরে নিজস্ব গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধান বন্ধ ছিল, যা এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। এই লক্ষ্যে বাপেক্সকে ৫০টি নতুন কূপ খননের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং স্থল ও সমুদ্র—উভয় অঞ্চলেই অনুসন্ধানের জন্য পিএসসি চুক্তি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এছাড়া ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এই খাতের অবকাঠামো নির্মাণে সব ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলার পাচারের ফলে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার বড় ধরনের ধসের মুখে পড়েছিল। যদিও এখন ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং পুঁজিবাজারে ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তবে ইতোমধ্যে সাত বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বেরিয়ে গেছে। তবে আশার কথা হিসেবে তিনি জানান, নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটের ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার তহবিলের ১৬ জন বিশ্বমানের বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এক সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে তারা বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, বন্ড ও ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট শু জিওং, আইইউভির উপাচার্য ম তামিম, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মো. মাহবুব উর রহমান প্যানেল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এফআইসিসিআই সভাপতি রূপালী চৌধুরী এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইইইএফএ-র প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।