স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, চলতি মাসের মধ্যেই এই আবেদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সোমবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

উত্তরণ প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) প্রয়োজনীয় ধাপগুলো বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সফলভাবে পার করেছে। এখন বিষয়টি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে তিন বছর সময় বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি মনে করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশের এই বাড়তি সময়ের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে দাবি করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০২৪ সালে এর প্রস্তুতিকাল শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারীর প্রভাবে দুই বছর অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাওয়ায় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এই তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এলডিসি স্ট্যাটাস থাকলে ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাওয়া যায়, যা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে আর থাকবে না। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘকে সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয় এবং ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে এর জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিন বছর বাড়তি সময় চাওয়ার কারণ হিসেবে বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি ছিল অপর্যাপ্ত। তার মতে, প্রস্তুতির চেয়ে উত্তরণকে 'রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত' করার চেষ্টা বেশি করা হয়েছে, ফলে সম্ভাব্য অসুবিধা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরিতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেই সংক্রান্ত একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ইইউ-এর সাথে ইতিমধ্যে শেয়ার করা হয়েছে।

বিশ্ববাজারে পণ্যের প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি দেশের সাথে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ করা হয়েছে এবং কারিগরি আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রী আশা করেন, উত্তরণের আগেই এই আলোচনা শেষ হবে, ফলে হয়তো জিএসপি প্লাস সুবিধার প্রয়োজন পড়বে না। এছাড়া আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসেপ)-এ যোগ দেওয়ার নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং বর্তমানে প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে।

বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। জ্বালানিসংকটকে বিনিয়োগের প্রধান বাধা উল্লেখ করে তিনি জানান, নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, গ্যাসকূপ খনন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে সরকার। সেমিনারটিতে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফটিআই প্রধান নির্বাহী মোস্তফা আবিদ খান।