বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সস্তায় মুরগির মাংস সরবরাহ করে বাজার দখল করে নিচ্ছে চীন। দেশটির ভেতরে প্রাণিজ আমিষের চাহিদায় পরিবর্তন এবং উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় এখন আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রিতে বিশেষ জোর দিচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে বৈশ্বিক মাংস বাজারে প্রতিযোগিতার এক নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান 'উইনটপ ফুড'-এর কার্যালয়ে বর্তমানে ঘানা, ইরাক, জর্ডান, রাশিয়া এবং সেনেগালের মতো দেশ থেকে আসা ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোম্পানিটির মহাব্যবস্থাপক ডাং ইয়াংইয়াং জানান, তারা বছরে প্রায় ছয় কোটি মুরগি প্রক্রিয়াজাত করেন এবং ২০টিরও বেশি দেশে নাগেট, মিটবল ও ডাম্পলিংয়ের মতো পণ্য রপ্তানি করছেন।
বিদেশি ক্রেতাদের এই আকর্ষণের প্রধান কারণ হলো পণ্যের অত্যন্ত কম দাম। ব্রাজিল বা থাইল্যান্ডের মতো বড় রপ্তানিকারকদের তুলনায় চীনা কোম্পানিগুলো প্রতি টনে প্রায় এক হাজার ডলার কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে। ডাং ইয়াংইয়াংয়ের মতে, আগে চীনা মাংসের গুণগত মান নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সন্দেহ থাকলেও, বর্তমানে দামের বিশাল ব্যবধানের কারণে ক্রেতারা বাধ্য হয়ে চীন থেকে পণ্য কিনছেন, অন্যথায় তারা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
চীনের এই রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। দীর্ঘকাল ধরে শূকরের মাংস দেশটির প্রধান আমিষের উৎস থাকলেও বর্তমানে তার চাহিদা কমেছে, যার ফলে মুরগির মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে চীন এখন মুরগির মাংসের নিট রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চীনের মুরগির মাংস রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া দুগ্ধজাত পণ্যের রপ্তানিও বাড়ছে, যা চলতি বছর ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা এবং খামারের আকার বড় করার মাধ্যমে এই সক্ষমতা অর্জন করেছে চীন। যেমন, উইনটপ ফুডের একটি খামারে যেখানে আগে ২০ হাজার মুরগি পালন করা হতো, সেখানে এখন ১ লাখ ২০ হাজার মুরগি পালন করা হয়। পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি ও সহায়তার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনা কৃষকদের মোট আয়ের প্রায় ১৩ শতাংশ এসেছে সরকারি সহায়তা থেকে।
তবে চীনের এই আগ্রাসী রপ্তানি নীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও জার্মানির উৎপাদকরা এখন কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই চীন থেকে হাঁসের মাংস আমদানির বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং মটরশুঁটির আমদানিতে ৪১ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। শুধু মাংস নয়, শিশুদের গুঁড়াদুধসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের বাজারও বড় করার চেষ্টা করছে তারা। তবে অতিরিক্ত উৎপাদন ও বাণিজ্য উদ্বৃত্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক বিরোধ আরও ঘনীভূত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে নতুন বিধিনিষেধের জন্ম দিতে পারে।




