চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সম্প্রতি পাঁচ দিনব্যাপী 'ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস' অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক ইভেন্টে চীনের ৬৬০টিরও বেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ২ হাজারেরও বেশি রোবট অংশ নেয়। প্রদর্শনীতে রোবটদের মার্শাল আর্ট, কিকবক্সিং এবং ব্রেকড্যান্সিংয়ের মতো বিভিন্ন ইভেন্টে দক্ষতা দেখানো হয়। তবে কেবল সাফল্য নয়, ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রচণ্ড গতিতে ছুটে গিয়ে রোবটগুলোর দেয়ালে আছড়ে পড়ে ভেঙে পড়ার দৃশ্যগুলো দর্শক ও নেটিজেনদের মধ্যে হাস্যরস এবং বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ব্যর্থতার ভিডিওগুলো ভাইরাল হলেও চীন একে তাদের প্রকৌশলগত সাহসিকতা হিসেবেই প্রচার করেছে।

এই আয়োজনের পেছনে চীনের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা রোবটের আমদানি নিষিদ্ধ করার পর এবং ইলন মাস্কের 'অপটিমাস' হিউম্যানয়েড বাজারে আসার প্রস্তুতি নেওয়ায় চীন তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে চায়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশই চীনের দখলে, যারা গত এক বছরে ১২ হাজার ৮০০টি রোবট তৈরি করেছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এই প্রযুক্তিকে দেশের অগ্রগতির মূল হাতিয়ার মনে করে, যা ভবিষ্যতে শ্রমিকের ঘাটতি মেটানো, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি জোরদার করতে সহায়ক হবে। দেশটির পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রযুক্তিগত উন্নতির দিক থেকে 'তিয়াংগং আলট্রা' নামক রোবটটি গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে ১০০ মিটার দৌড় শেষ করেছে এবং এর লাফানোর উচ্চতা শূন্য দশমিক ৯৬ মিটার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৪০ মিটারে পৌঁছেছে। লিকুইড কুলিং প্রযুক্তির ব্যবহারে মোটরের শক্তি ও গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ত্রিশান্ত নানায়াক্কারা মনে করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এই গতিতে এগোলে পুরো প্রযুক্তির বিশ্ব বদলে যাবে।

এতসব অগ্রগতির মাঝেও বিশেষজ্ঞরা কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। ইউনিট্রি-র প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং জিংজিং-এর মতে, এআই মডেলগুলো এখনো বাস্তব জগতের জটিলতা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ঘাটতি রয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে আরও ১০ বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে পরামর্শক জর্জ স্টিলার লক্ষ্য করেছেন যে, প্রদর্শনীতে আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখা গেলেও দৈনন্দিন কাজের উপযোগী স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির অভাব ছিল। বিশেষ করে বোতল খোলা বা পানি ঢালার মতো সাধারণ কাজে রোবটগুলো হিমশিম খেয়েছে। এমনকি একটি চ্যালেঞ্জে ব্যর্থ হলে দ্রুত দৃশ্যপট বদলে দেওয়া হয়, যা প্রমাণ করে বাস্তব জীবনে কার্যকর করতে হলে এখনো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও গবেষণার প্রয়োজন। এছাড়া রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যার উদাহরণ হিসেবে কিয়েভে ইউক্রেনের রোবটিক অস্ত্র প্রদর্শনীকেও দেখা হচ্ছে।