সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় সংক্ষিপ্তসার তৈরি হওয়ার ফলে বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহীরা এখন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বই এবং প্রতিবেদন পড়ছেন। এই প্রবণতা নিয়ে নিজেরাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তারা। ফরচুনের সিইও ডেইলি নিউজলেটারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক সিইও স্বীকার করেছেন যে এআই-নির্মিত সারাংশের ওপর নির্ভরতার কারণে তারা গভীর পাঠের অভ্যাস হারিয়ে ফেলছেন। তারা মনে করছেন, এই সংক্ষিপ্তসারগুলো পড়লে তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা এবং যুক্তির মৌলিকত্ব ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

আর্থিক পরিষেবা খাতের এক সিইও বলেছেন, “আমাকে চিন্তা করার জন্য বেতন দেওয়া হয়। আমি বুঝতে পেরেছি, এই সংক্ষিপ্তসার পড়ার ফলে আমি যুক্তির সূক্ষ্মতা হারাচ্ছি। ধীরে পড়া, গভীরভাবে পড়া—তা হজম করার সময় দেয়।” তাঁর এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, দ্রুত তথ্য গ্রহণের এই যুগে ধীর পাঠের মূল্য অনেক বেড়ে গেছে।

এদিকে, অনলাইন জগতে এআই-নির্মিত কনটেন্টের বিস্ফোরণ ঘটছে। লিংকডইনের “সিমস লাইক এআই স্লপ” বোতামে ইতিমধ্যে এক মিলিয়নেরও বেশি ক্লিক পড়েছে। গ্রাফাইটের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন মানুষের লেখার চেয়ে এআই-নির্মিত নিবন্ধের সংখ্যাই বেশি। এমনকি বিনিয়োগকারী স্ট্যান ড্রাকেনমিলার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে এআই দিয়ে লেখা একটি মতামত নিবন্ধ প্রকাশ করলে তা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সম্পাদকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে কেউ কেউ মনে করেন, একটি নিবন্ধ যদি কৃত্রিম, পূর্বানুমানযোগ্য এবং ব্যক্তিত্বহীন হয়, তবে তার জন্য সম্পাদকই দায়ী।

এআই-এর যুগেও মানবিক অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন ডাইমেনশনাল ফান্ড অ্যাডভাইজার্সের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বুথ। তাঁর নতুন বই “স্টে ক্যালম”-এ তিনি নিজের জীবনের গল্প বলেছেন—কানসাসের একজন জুতা বিক্রেতা থেকে কীভাবে তিনি এক ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পৌঁছেছেন। এই বইটি কেবল তাঁর নিজেরই বলার মতো গল্প, যা দেখায় যে এআই কখনোই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প হতে পারে না।

বুকশপ.অর্গের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি হান্টার বলেছেন, তিনি এআই ব্যবহার করেন কোড রিভিউয়ের জন্য, কিন্তু গ্রাহকদের বইয়ের সুপারিশে নয়। তিনি এআই-নির্মিত বইয়ের ব্যাপারে বিশেষ উদ্বিগ্ন, কারণ সার্চ ট্রেন্ডের ভিত্তিতে তৈরি এসব বই মানুষকে প্রতারিত করার চেষ্টা করে। তাঁর মতে, “মানুষের জন্য মানুষের সুপারিশই সঠিক। স্বাধীন বুকস্টোরের কাজই হলো মানুষের সুপারিশ দেওয়া। এআই স্লপের সমাধান হলো মানবিক কিউরেশন ও সৃষ্টি।” তিনি আরও বলেন, আমাজন গ্রাহকদের এ ধরনের প্রতারণা থেকে সুরক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না।

ওয়ান স্ট্র্যাটেজি গ্রুপের সিইও ডেভিড মিডভিন প্রশ্ন তুলেছেন, “এআই কি আপনাকে আরও সাধারণ করে তুলছে?” তার মতে, কনটেন্ট তৈরির সহজলভ্যতার কারণে সবাই এখন প্রায় একই মানের লেখা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্ব তখনই আসে যখন কেউ মানবিক সৃজনশীলতা ও মৌলিকত্ব ধরে রাখে। গত বছর প্রায় ৪০ শতাংশ আমেরিকান কোনো বই পড়েননি—এই পরিসংখ্যানও ইঙ্গিত দেয় যে, পাঠ্যাভ্যাস সংকটে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির গভীরতা বোঝার জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই।