কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের উদীয়মান 'নিওক্লাউড' সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কোরওয়েভ (CoreWeave) বর্তমানে এক চরম আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট চামাত পালিহাপিটিয়া এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি চার্ট প্রকাশ করেন, যেখানে দেখা যায় কোরওয়েভের বন্ডের ইল্ড ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, বিনিয়োগকারীরা এই কোম্পানির ঋণ ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত উচ্চ প্রিমিয়াম দাবি করছেন। পালিহাপিটিয়া প্রশ্ন তুলেছেন, এআই অবকাঠামো নির্মাণ কি আসলে একটি গোপন ক্রেডিট বাবলের সৃষ্টি করছে?
এই উত্তেজনার মধ্যেই ফিনান্সিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে কোরওয়েভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও অর্থ বিভাগের প্রধান ব্রানিন ম্যাকবি জানান, তিনি বীমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আরও অর্থ ঋণ নিতে আগ্রহী। তার মতে, বীমা খাতের পুঁজির পরিমাণ কার্যত সীমাহীন, যা কোম্পানির বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
কোরওয়েভের ঋণের বোঝা আগে থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ২০২৫ সালে ফরচুন ম্যাগাজিনের এক আর্থিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, এই কোম্পানিটি ভবিষ্যতে এআই খাতের একটি বড় ধরনের আর্থিক ধসের মূল কারণ হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ গার্টনারের এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ নিওক্লাউড প্রোভাইডার স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে না, কারণ তাদের আয় ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম হবে।
কোম্পানির আর্থিক চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। দ্বিতীয় প্রান্তিকের উপার্জনের তথ্যানুসারে, কোরওয়েভের অপারেটিং লিজ দায় ১৬.৩ বিলিয়ন ডলার এবং মোট ঋণ ৩৫.৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ ওই প্রান্তিকে তাদের মোট আয় ছিল মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন ডলার এবং অপারেটিং ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় নিট লোকসান হয়েছে ১.৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে মোট ৫২ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণের বোঝা তারা কীভাবে শোধ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে নিওস্টেলার ক্যাপিটাল কর্পোরেশনের প্রিন্সিপাল ইভান শ্লোসম্যান এই আশঙ্কার বিরোধিতা করেছেন। তিনি জানান, কোরওয়েভের কাছে ১০৩.৭ বিলিয়ন ডলারের 'রিমেইনিং পারফরম্যান্স অবলিগেশন' (RPO) বা বকেয়া সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যার ৪১ শতাংশ ২০২৮ সালের মধ্যে পরিশোধ হওয়ার কথা। এগুলো মূলত 'টেক-অর-পে' (take-or-pay) চুক্তি, যেখানে গ্রাহক সেবা ব্যবহার না করলেও টাকা দিতে বাধ্য থাকেন। কোরওয়েভের প্রধান গ্রাহকদের মধ্যে মাইক্রোসফট এবং ওপেনএআই-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শ্লোসম্যানের মতে, মাইক্রোসফটের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় ঋণদাতারা আশ্বস্ত থাকেন এবং এই উচ্চ ঋণ নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
কোরওয়েভ নিজেই ফরচুনকে জানিয়েছে, তাদের ৯৮ শতাংশ আয় এই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ চুক্তি থেকে আসে এবং তারা তাদের অর্থায়ন এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে গ্রাহকের কাছ থেকে আসা নগদ অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা যায় এবং বাড়তি নগদ প্রবাহ তৈরি হয়।
তবে এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন সমালোচকরা। হিসাববিজ্ঞানী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ফ্র্যান্সিন ম্যাককেনা মনে করেন, যদি কম্পিউটিং পাওয়ারের চাহিদা কমে যায়, তবে মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই চুক্তি রক্ষা করবে না। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মাইক্রোসফট অত্যন্ত কঠোর এবং প্রয়োজনে তারা কোরওয়েভকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে। বর্তমানে এই বিতর্কই এআই খাতের আর্থিক ঝুঁকির এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।




