তিন-চার দশক আগে বাংলাদেশের প্রায় সব প্রান্তেই মদনটাক পাখির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত, যা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে এই পাখিটি অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব সীমিত কিছু এলাকায়, বিশেষ করে সুন্দরবন এবং উত্তরবঙ্গের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে মাঝে মাঝে এদের দেখা মেলে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ তার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে জানান, ২০২১ সালের শীতকালে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার চড়ইল বিলে এই পাখির দেখা পান। ভারত সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত এই বিলে সারা বছরই মদনটাক পাখির অবস্থান থাকে। এছাড়া পঞ্চগড়েও মাঝে মাঝে এই পাখির খবর পাওয়া যায়, তবে নিয়মিত উপস্থিতি না থাকায় সেখানে অনুসন্ধান চালানো হয় না।

২০২২ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহীর মাধ্যমে একটি মদনটাক কলোনির সন্ধান পাওয়া যায়। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ভারত সীমান্তের কাছে গিয়ে সেখানে ২০-২৫টি পাখির একটি দল দেখা গিয়েছিল। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, এই পাখিগুলো খাবারের সন্ধানে প্রায়ই ভারতের অভ্যন্তরে চলে যায়। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে পুনরায় ওই এলাকায় গিয়ে রোদঝলমলে দিনে প্রচুর পাখির ছবি তোলা সম্ভব হয় এবং নাগর নদের পাড়ে ও আকাশে এদের ওড়ার দৃশ্য দেখা যায়।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ এই পাখিটি সুন্দরবনেও স্বল্প সংখ্যায় বর্তমান। ২০২৪ সালে সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়েও লেখকের দেখা মেলে কয়েকটি মদনটাক পাখির।

শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কথা বললে, মদনটাক পাখির বৈজ্ঞানিক নাম 'Leptoptilos javanicus'। এটি দেখতে অনেকটা বড় বকের মতো এবং এর দৈর্ঘ্য ১১০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো কাঠরঙের শক্ত দীর্ঘ ঠোঁট, যার উপরের অংশ আরও গাঢ়। মাথায় খুব সামান্য পালক থাকায় একে টাকমাথার মতো দেখায়, তাই এর নাম মদনটাক। পাখির গলা হলুদ এবং বুকের অংশ সাদা। পালকের উপরের অংশে নীল ও কালোর সংমিশ্রণ দেখা যায় এবং এর পা দুটি বেশ লম্বা।

দেশ থেকে এই প্রজাতির পাখিটি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। তাই যে সামান্য কিছু এলাকায় এখনো এদের অস্তিত্ব বিদ্যমান, সেখানে যেন তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকে, সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।