কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুরে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে একটি মেঠো পথকে ১৮ ফুট প্রশস্ত পাকা সড়কে রূপান্তর করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি নির্মাণ করছে। তবে এই প্রকল্পের ফলে দেশের একমাত্র পাহাড়ি বনসমৃদ্ধ মহেশখালীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া এই মেঠো পথের বিভিন্ন অংশে ইতিমধ্যে কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বনের ভেতরেই পাহাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং পানের বরজ। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখানে বসবাসকারী চার হাজারেরও বেশি মানুষই নথিতে জবরদখলকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত। এই সড়কটি নির্মিত হলে ওই দখলদারদের যাতায়াত সহজ হবে এবং বনের ভেতরের অবৈধ বসতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও তদারককারী মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, এই রাস্তাটি হলে পার্শ্ববর্তী কালামারছড়া ইউনিয়নে দ্রুত যাতায়াত করা সম্ভব হবে। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তারা অবগত নন এবং তারা সরকারি জমিতেই বসবাস করছেন বলে স্বীকার করেন।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৫৭ সালে বন আইন-১৯২৭ সালের ২০ ধারা অনুযায়ী ১২ নম্বর পাহাড় মৌজাকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়েছিল, যার আয়তন ১৮ হাজার ২৮৬ একর। চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র সরকার জানান, আইনত সংরক্ষিত বনের ভেতরে কোনো অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। বন বিভাগ বাধা দিলেও গায়ের জোরে কাজ চলছে, যার প্রেক্ষিতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির এবং মহেশখালীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল হক সতর্ক করে বলেন, এই সড়ক নির্মিত হলে বনের অবশিষ্ট অংশটুকুও রক্ষা করা সম্ভব হবে না এবং বন উজাড়ের প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যাবে।
প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বন বিভাগের কাছে প্রশাসনিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছিলেন। তবে বন বিভাগ চিঠির মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এটি একটি সংরক্ষিত বনভূমি হওয়ায় এখানে সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই। এই বনটি চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, মুখপোড়া হনুমান এবং সংকটাপন্ন পাহাড়ি কচ্ছপসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। সড়ক নির্মাণের ফলে বনের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি হবে।
আইনি দিক থেকে দেখলে, 'বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬'-এর ৭ ধারা অনুযায়ী প্রাকৃতিক বনকে বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এছাড়া জাতীয় বননীতি-২০২৫ এবং সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীও সংরক্ষিত বনের ভেতরে কোনো স্থাপনা তৈরি করা নিষেধ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জানান, সড়কটি তাদের আইডিভুক্ত এবং এটি হলে দুই ইউনিয়নের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার থেকে কমে সাড়ে চার কিলোমিটারে নামবে। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞার দাপ্তরিক নথি তিনি এখনও পাননি বলে দাবি করেন।




