জীবনের নানা সংকটে মন ভেঙে গেলে অনেকেই নিজেকে অসহায় মনে করেন। তবে ইসলামি বিশ্বাস ও জাপানি শিল্পদর্শনের সমন্বয়ে এই লেখায় ফুটে উঠেছে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি। জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘কিনৎসুকুরোই’ পদ্ধতিতে ভাঙা মাটির পাত্র ফেলে না দিয়ে সোনা বা রুপার গুঁড়া মেশানো রেজিন দিয়ে ফাটলগুলো জুড়ে দেওয়া হয়। ফাটল যত বেশি, সোনার প্রলেপ তত বেশি, ফলে পাত্রটি হয়ে ওঠে অনন্য শিল্পকর্ম। এই দর্শন মানবজীবনেরই রূপক, যেখানে দুঃখ-কষ্টই মানুষকে অহংকার ভেঙে স্রষ্টার কাছে সমর্পিত হতে শেখায়।
জীবনে চলার পথে ব্যর্থতা, প্রিয়জনের হারানো, সম্পর্কের বিচ্ছেদ কিংবা অনুতাপ—নানাভাবে হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সব অবলম্বন ব্যর্থ মনে হলে একজন বিশ্বাসী তখন অশ্রুসিক্ত নয়নে সেজদায় বলে ওঠে, ‘আল্লাহ, আপনি ছাড়া তো আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।’ আকাশে মেঘ জমে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার মতোই জীবনের কিছু ভাঙন ধ্বংসের নয়, বরং নতুন জীবনের সূচনা। এই ভাঙনের মধ্য দিয়েই মৃত জমিনে প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসে।
আল্লাহ তাআলার গুণবাচক নাম ‘আল-জাব্বার’—যিনি পরাক্রমশালী, আবার ‘জাবর’ শব্দমূল থেকে যার অর্থ ভাঙা হাড় জোড়া লাগানো ও ক্ষতিগ্রস্তকে পূর্ণতা দান। তিনিই বান্দার ভগ্ন হৃদয়কে নিজ রহমতে পুনরুদ্ধার করেন। রাসুল (সা.) দুই সেজদার মাঝের বৈঠকে এই দোয়া পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মাগফির লি, ওয়ারহামনি, ওয়াজবুরনি, ওয়াহদিনি, ওয়ারজুকনি’—অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, দয়া করুন, আমার ভাঙন পূরণ করুন, সঠিক পথ দেখান এবং রিজিক দিন।’ প্রতিটি নামাজের এই প্রার্থনার মাধ্যমে মুমিন সেই সত্তার কাছে ফরিয়াদ জানায়, যিনি অন্তরের সব ভাঙন সম্পর্কে অবগত এবং তা মেরামতের ক্ষমতা রাখেন।
ভাঙা পাত্রে যেমন সোনা ব্যবহার হয়, তেমনি মুমিনের ভাঙা অন্তর জোড়া লাগানোর উপকরণ হলো সবর, তাওয়াক্কুল, তওবা-ইস্তিগফার এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। হাদিসে এসেছে, মুমিনের প্রতিটি বিষয়ই আশ্চর্যজনক—সুখে শোকর এবং দুঃখে ধৈর্য ধারণ করলে প্রতিটি অবস্থায় তার কল্যাণ নিহিত। জাপানি শিল্পে কারিগর মানুষ হলেও বিশ্বাসীর জীবনে ভাঙা মন গড়ার আসল কারিগর আল্লাহ নিজেই। বান্দা যত নিষ্ঠার সঙ্গে সবর ও তাওয়াক্কুল আঁকড়ে ধরবে, তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয় তত দৃঢ় ও প্রজ্ঞাময় হয়ে উঠবে।
আঘাতের পর জীবন আগের মতো না-ও হতে পারে, অনেক ক্ষতের দাগ চিরকাল থেকে যায়। কিন্তু ভাঙা পাত্র যেমন সোনার প্রলেপে আগের চেয়ে মূল্যবান হয়, তেমনি দুঃখে ভেঙে পড়া মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরলে আত্মায় সমৃদ্ধ হয়। জীবনের অসম্পূর্ণতা ও দাগ নিয়েই যখন বান্দা সেজদায় অশ্রু ফেলে, তখনই তার ভাঙা জীবন সর্বোচ্চ অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ভাঙন নিয়ে লজ্জিত না হয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়াই বিশ্বাসীর শক্তি—‘ওয়াজবুরনি’, হে আল্লাহ, আমার ভগ্ন হৃদয়কে আপনার রহমতে জুড়ে দিন।




