বটগাছ পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর গাছগুলোর একটি। এর বিস্তৃতি প্রক্রিয়া দেখে অনেকেই মনে করেন গাছটি যেন হেঁটে চলেছে। আসলে বটগাছের ডাল থেকে ঝুলে পড়া বায়বীয় শিকড় মাটিতে প্রবেশ করে নতুন কাণ্ডে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে একটি মাত্র গাছ বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনই একটি দৃষ্টান্ত দেখা যায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হিরনাল এলাকায়। প্রায় তিন বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত একটি বটগাছ সেখানে অবস্থিত। স্থানীয়দের ধারণা, গাছটির বয়স কয়েক শত বছর। কেউ বলেন ৩০০ থেকে ৪০০ বছর, আবার কেউ বলেন ৫০০ বছরও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সঠিক বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। গাছের ডালপালা এত বেশি ছড়িয়ে যে দূর থেকে একে অনেকগুলো গাছ বলে মনে হয়। আসলে সবগুলোই সেই একই বৃক্ষের অংশ।

কলকাতার আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেনে অবস্থিত 'গ্রেট বটগাছ' আরেকটি বিস্ময়। প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই গাছটির বয়স ২৫০ বছরেরও বেশি। এর ডালপালার উচ্চতা প্রায় ২৪ মিটার পর্যন্ত। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এটি একটি ঘন বন, কিন্তু আসলে তা একটি মাত্র বৃক্ষ।

বটগাছের প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম Ficus benghalensis। বহু প্রজাতির বটগাছকে 'স্ট্র্যাংলার ফিগ' বলা হয়, কারণ এদের জীবন শুরু হয় অন্য গাছের ওপর। বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার পর শিকড় মাটিতে নেমে আসে এবং ধীরে ধীরে আয়তন বাড়িয়ে দেয়। এলাকা দখলের দিক থেকে বটগাছ অন্যতম বৃহৎ গাছ হিসেবে পরিচিত। তবে গাছের মোট আয়তন বা কাঠের পরিমাণের বিচারে সবচেয়ে বড় হলো ক্যালিফোর্নিয়ার সিকোয়া ন্যাশনাল পার্কের 'জেনারেল শেরম্যান' নামের একটি জায়ান্ট সিকোয়া। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো এই গাছের আয়তন প্রায় ১ হাজার ৪৮৭ ঘনমিটার।

ইতিহাসের সাথেও বটগাছ জড়িয়ে আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভারত আক্রমণে এসে প্রথম বটগাছ দেখেন বলে ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ শাসনামলে এই গাছের ব্যবহার ছিল ভয়ংকর। ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহীদের ফাঁসি দেওয়ার জন্য অনেক সময় বটগাছের ডাল ব্যবহার করা হতো। ১৮৫০-এর দশকে শত শত মানুষকে এই গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ভারত স্বাধীনতার পর বটগাছ আবার সম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং দেশটির জাতীয় গাছ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বটগাছের শিকড় শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যেই নয়, মানুষের কাজেও লাগে। মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় স্থানীয় মানুষ রাবার গাছের (Ficus elastica) শিকড় একত্রে বুনে নদী পার হওয়ার জন্য জীবন্ত সেতু তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিকড়গুলো শক্ত হয়ে ৫০০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে টিকে থাকে। হাওয়াইয়ের মাউই দ্বীপের 'লাহাইনা বটগাছ' ১৮৭৩ সালে রোপণ করা হয়েছিল। বর্তমানে গাছটির উচ্চতা প্রায় ১২ মিটার এবং ছায়ার পরিধি প্রায় ৪০০ মিটার।

বাড়িতে বটগাছ লাগানো কি সম্ভব? সাধারণত বড় জায়গা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। কারণ বটগাছের বেড়ে ওঠার জন্য অনেক খোলা জায়গা ও আর্দ্র আবহাওয়া প্রয়োজন। কিছু প্রজাতি ঘরের ভেতরেও জন্মানো যায়, তবে সেখানে পর্যাপ্ত আলো ও নিয়মিত পানি দিতে হয়। তারপরও বন্য পরিবেশের মতো এরা দীর্ঘজীবী বা বিশাল আকৃতির হয় না।