রাতের শহরের রাস্তা বা পার্কে হাঁটতে গেলে মাথার ওপর জ্বলতে থাকা স্ট্রিটলাইটগুলো চোখে পড়ে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছের সঙ্গে আলোর মেলবন্ধন অনেকের কাছে নান্দনিক মনে হতে পারে। কিন্তু এই দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে গাছগুলোর জন্য লুকিয়ে আছে এক নীরব সংকট। দিনের আলো আর রাতের অন্ধকার—দুটি পর্যায়ই উদ্ভিদের জীবনচক্রের জন্য অপরিহার্য। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর মতো গাছও সূর্যের আলো ওঠা-নামার সঙ্গে নিজেদের নানা শারীরবৃত্তীয় কাজের সমন্বয় ঘটায়। এই নিয়মিত চক্রটি বিজ্ঞানের ভাষায় ফটোপিরিয়ড বা আলোকপর্যায় নামে পরিচিত। কৃত্রিম আলো এই চক্রে বাধা সৃষ্টি করলে গাছের ফুল ফোটানো, কুঁড়ি গজানো, পাতা ঝরা, বৃদ্ধি এমনকি রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শহরগুলোতে এখন রাত মানেই পুরোপুরি অন্ধকার নয়। রাস্তা, অফিস, পার্ক, খেলার মাঠ কিংবা বিজ্ঞাপনের বোর্ড—সব জায়গায় রাতভর আলো জ্বলে থাকে। মানুষের কাছে এটি সুবিধাজনক হলেও গাছপালার জন্য এটি মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। চাঁদ, তারা ও অন্যান্য মহাজাগতিক উৎস থেকে রাতে সামান্য আলো আসে, কিন্তু মানুষের তৈরি অতিরিক্ত আলোর কারণে রাতের স্বাভাবিক অন্ধকার কমে গেলে তাকে বলা হয় আলোকদূষণ। বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় আলোকদূষণের মধ্যে বসবাস করে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এই হার প্রায় ৯৯ শতাংশ, আর এশিয়াতেও এটি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গাছের ভেতরে দিন-রাতের হিসাব রাখার জন্য রয়েছে একটি অভ্যন্তরীণ ঘড়ি, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান ঘড়ি। প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই জৈবিক ছন্দ গাছের বৃদ্ধি, ফুল ফোটানো ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বিত থাকে। দিনের বেলা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে গাছ, আর রাতে অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে কোষের ডিএনএ প্রতিলিপি তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে। আলো চেনার জন্য গাছের শরীরে রয়েছে ফাইটোক্রোম নামের বিশেষ রঞ্জক, যা দুই রূপে থাকতে পারে—নিষ্ক্রিয় 'Pr' এবং সক্রিয় 'Pfr'। আলো পড়লে Pr রূপান্তরিত হয় Pfr-এ, আর অন্ধকারে তা আবার ফিরে আসে। এই দুই রূপের অনুপাতের ওপরই কুঁড়ি গজানো ও ফুল ফোটার মতো অনেক প্রক্রিয়া নির্ভর করে। ঋতুভেদে দিন-রাতের দৈর্ঘ্য বদলালে গাছ সেই পরিবর্তন বুঝে নিজের জীবনচক্র সাজায়। তাই রাতের অন্ধকারে হঠাৎ কৃত্রিম আলো জ্বলে উঠলে গাছের কাছে যেন দিনের হিসাবটাই পাল্টে যায়।

সন্ধ্যা নামলে অনেক গাছের পাতা বা ফুল বন্ধ হয়ে যায়। ক্লোভার, টিউলিপ কিংবা প্রেয়ার প্ল্যান্টের মতো উদ্ভিদের পাতা রাতে ভাঁজ হয়ে যেতে দেখা যায়, যা দেখে মনে হতে পারে গাছ বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনও এই আচরণ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ১৮৮০ সালে ছেলে ফ্রান্সিস ডারউইনের সঙ্গে লেখা 'দ্য পাওয়ার অব মুভমেন্ট ইন প্ল্যান্টস' বইয়ে তিনি এই নড়াচড়াকে 'স্লিপ মুভমেন্টস' বা ঘুমের মতো নড়াচড়া হিসেবে বর্ণনা করেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা একে বলেন নিকটিন্যাস্টি। তবে এটি প্রাণীর ঘুমের মতো নয়—গাছের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র বা চোখের পাতা নেই। পাতার গোড়ায় থাকা পালভিনি নামের ছোট, স্ফীত অংশের কোষে পানির পরিমাণ পরিবর্তনের কারণে পাতা ওঠানামা করে। রাতে এক পাশের কোষ থেকে পানি বেরিয়ে গেলে পাতা নুয়ে পড়ে, আর পানি ফিরে এলে পাতা আবার উঠে যায়।

রাতে সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ থাকলেও গাছ নিষ্ক্রিয় থাকে না। দিনের আলোয় তৈরি করা শর্করা ব্যবহার করে তখন শ্বসন, বৃদ্ধি ও কোষ মেরামতের মতো কাজ চলতে থাকে। কিন্তু শহরের কৃত্রিম আলো এই প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। তীব্র আলো পেলে কোনো কোনো উদ্ভিদ রাতেও সালোকসংশ্লেষণ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যার ফলে কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হতে পারে এবং কোষের ক্ষতিও হতে পারে। বিশেষ করে স্বল্পদিবসী উদ্ভিদের জন্য এই সমস্যা আরও মারাত্মক—তারা দীর্ঘ রাত বা একটানা অন্ধকারের ওপর নির্ভর করে ফুল ফোটায়, তাই রাতে সামান্য কৃত্রিম আলোও তাদের ফুল ফোটার সময় পিছিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিবসী উদ্ভিদ, যেমন পালংশাক ও মুলা, রাতের অতিরিক্ত আলোর কারণে স্বাভাবিক সময়ের আগেই ফুল বা বীজ ধরার দিকে চলে যেতে পারে। টমেটো ও শসার মতো দিন-নিরপেক্ষ উদ্ভিদ অবশ্য এই দৈর্ঘ্যের ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল।

যুক্তরাজ্যে ১৩ বছর ধরে চালানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের কৃত্রিম আলোয় আলোকিত এলাকায় পাতাঝরা গাছের কুঁড়ি অন্য এলাকার তুলনায় গড়ে ৭.৫ দিন আগে ফুটেছে। অর্থাৎ রাস্তার বাতির আলো গাছের ঋতুভিত্তিক জীবনচক্রও বদলে দিতে পারে। কিছু ক্যাকটাস আবার শুধু রাতেই ফুল ফোটায়—সারা রাত কৃত্রিম আলো থাকলে সেসব ক্যাকটাসের ফুল ফোটাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

শুধু গাছই নয়, রাতের কৃত্রিম আলো নিশাচর পতঙ্গদেরও প্রভাবিত করে। মথ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরাগবাহী, কিন্তু কৃত্রিম আলোয় আলোকিত এলাকায় মথের মোট সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। স্ট্রিটলাইট মথকে আকৃষ্ট করে, ফলে তারা ফুলের কাছে যাওয়ার বদলে বাতির চারপাশেই ঘুরতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মথের মাত্র ২৩ শতাংশের শরীরে পরাগ পাওয়া গেছে, যার কারণে ফুলে পরাগ পৌঁছানোর হার এবং গাছে ফল ধরার হারও কমে যায়। কৃত্রিম আলো কোনো কোনো মথ ও মাকড়সার প্রজনন আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে পরাগবাহীর সংখ্যা কমে গেলে উদ্ভিদের বংশবিস্তার ও পুরো বাস্তুতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়ে। এমনকি রাতের কৃত্রিম আলো পরিযায়ী পাখিদের পথও বিভ্রান্ত করতে পারে, যা পরোক্ষভাবে বীজ ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।