প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অসামান্য ক্ষমতা, খরা ও তুষারপাত মোকাবিলা করার দক্ষতা এবং ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত এক ফুলের নাম রোজ অব শ্যারন। দক্ষিণ কোরিয়ায় একে বলা হয় ‘মুগুংহওয়া’, যার অর্থ অনন্তকাল বা অক্ষয় প্রাচুর্য। কোরীয় জাতীয় ফুল হিসেবে এটি দেশটির ইতিহাস ও অদম্য চেতনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Hibiscus syriacus। প্রথম এই গাছ সংগ্রহ করা হয়েছিল সিরিয়ার একটি বাগান থেকে, তাই প্রজাতিগত নামের শেষাংশ ‘সিরিয়াকাস’ রাখা হয়েছে। উত্তর আমেরিকায় এটি রোজ অব শ্যারন নামে পরিচিত, কোরিয়ায় কোরীয় জবা এবং অন্য নাম সিরীয় জবা। জবা ও রোজ অব শ্যারন দুটোই মালভেসি গোত্রের সদস্য। সাধারণ জবার সঙ্গে চেহারার মিল থাকলেও ফুলের রঙে পার্থক্য — এর ফুল সাধারণত নীলাভ গোলাপি বা গোলাপি বেগুনি রঙের হয়, ফুলের কেন্দ্রস্থল মেরুন বা গাঢ় গোলাপি।
আট বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার জেওলবুক-দো জেলার জেওনজু শহরে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রশাসনের (আরডিএ) এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন এক বাংলাদেশি প্রতিনিধি। সেই সূত্রে আরডিএর কৃষি কারিগরি কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় প্রবেশমুখে কাচঘেরা উদ্যানে সারি সারি বেগুনি রঙের ফুল চোখে পড়ে। জবার মতো দেখতে হলেও রং ভিন্ন হওয়ায় কৌতূহল জাগে। সঙ্গের কোরিয়ান গাইড জানান, এটি রোজ অব শ্যারন, কোরীয় ভাষায় মুগুংহওয়া — যা তাদের জাতীয় ফুল।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে রচিত চীনা ভৌগোলিক গ্রন্থ শান হাই জিং-এ কোরীয় উপদ্বীপে প্রাচীনকালে বিপুলসংখ্যক রোজ অব শ্যারন গাছ জন্মানোর উল্লেখ আছে। তখনকার কোরিয়ায় এর পাতা দিয়ে ভেষজ পানীয় তৈরি করা হতো এবং ফুল খাওয়া হতো। অষ্টম শতাব্দীতে জাপানে আনা হয়, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইউরোপে পরিচিতি পায় এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে ইংল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ‘রোজ অব শ্যারন’ নামটি প্রথম দেখা যায় হিব্রু ভাষার ‘তানাক’-এ, বাইবেলেও এর উল্লেখ আছে।
এই গাছ ২ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পাতা জবা ফুলের পাতার মতো, তবে পত্রফলকের কিনারার খাঁজে সামান্য ভিন্নতা আছে। বর্তমানে এর অনেক জাত তৈরি হয়েছে, যেগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন রং ও আকৃতির ফুল ফোটে। ফুলের মাঝখানে একটি খাটো পুংকেশর থাকে, সেখানে সাদাটে হলদে প্রচুর পরাগরেণু দেখা যায়। ফুল ক্ষণস্থায়ী — সকালে প্রস্ফুটিত হয়, বিকেলের আগেই মুদে যায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গ শহরেও এই ফুলের দেখা মেলে। বাংলাদেশে ফিরে দেশীয় উদ্ভিদের তালিকায় এর নাম পাওয়া যায় ‘নীল জবা’ হিসেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় বৃক্ষমেলায় ফুলসহ এই গাছ প্রদর্শিত হচ্ছে। রাজধানীর রমনা উদ্যানে নার্সারির ভেতরে বড় একটি গাছে গ্রীষ্মের শুরু থেকে শরৎকাল পর্যন্ত ফুল ফুটতে দেখা যায়। সকালে পাপড়ি সম্পূর্ণ না খুললেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলগুলো স্বমহিমায় প্রস্ফুটিত হয়ে আশপাশ আলোকিত করে। যেকোনো বাগানে শোভাবর্ধক ফুলগাছ হিসেবে এটি সহজেই লাগানো যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।




