দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ার মেঘাচ্ছন্ন ও উচ্চ আর্দ্রতাসম্পন্ন ইয়ুঙ্গাস অরণ্যে একটি ছোট আকারের বন বিড়ালের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যাকে বিড়াল পরিবারের সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই নতুন প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে 'লেপার্ডাস টিলকায়ো' (Leopardus tilcayo)। প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় পর বিড়াল প্রজাতির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নতুন প্রজাতির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হলো। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বন বিড়ালটি দৈর্ঘ্যে ১৮ ইঞ্চি এবং ওজনে প্রায় ১.৪ কেজি। বর্তমানে প্রাণীটি বলিভিয়ার একটি বন্যপ্রাণী পুনর্বাসনকেন্দ্রে অবস্থান করছে। গায়ে থাকা ছোপ ও ডোরাকাটা দাগের কারণে দীর্ঘকাল এটি অন্যান্য বন্য বিড়ালের সাথে মিশে ছিল, ফলে বিজ্ঞানীদের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। তবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি একটি স্বতন্ত্র প্রজাতি।

বলিভিয়ার লা পাজের ‘ইউনিভার্সিদাদ মায়র দে সান আন্দ্রেস’-এর গবেষক পাওলা নোগালেস-আস্কারুঞ্জ জানান, এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। তিনি উল্লেখ করেন যে, নতুন প্রজাতি খুঁজে পেতে সব সময় দ্বীপ বা গভীর সমুদ্রের প্রয়োজন হয় না, মূল ভূখণ্ডেই এমন বিস্ময় লুকিয়ে থাকতে পারে। এই আবিষ্কারের সূত্রপাত হয় 'টিগ্রিনো' নামক ১০ বছর বয়সী একটি বিড়ালের মাধ্যমে, যাকে স্থানীয় এক বাসিন্দা জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছিলেন। শুরুতে তাকে সাধারণ পোষা বিড়ালের ছানা মনে করা হলেও, বড় হওয়ার পর তার আচরণ ও শারীরিক গঠন অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় গবেষক নোগালেস-আস্কারুঞ্জ তার প্রতি আগ্রহী হন। পরবর্তীতে তিনি বিশ্বজুড়ে গবেষকদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন এবং জাদুঘরের সংরক্ষিত নমুনা ও জীবিত প্রাণীর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে এই রহস্য উন্মোচন করেন।

ব্রাজিলের ‘পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্রান্দে দো সুল’-এর জিনতত্ত্ববিদ এদুয়ার্দো আইজিরিক বলেন, পর্যাপ্ত তথ্য বা ছবির অভাব এবং যথাযথ অনুসন্ধানের অভাবে এই প্রজাতিটি এতদিন আড়ালে ছিল। বিজ্ঞান সাময়িকী 'কারেন্ট বায়োলজি'-তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, তথাকথিত 'টাইগার ক্যাট'-এর প্রজাতি তিনটি নয়, বরং মোট পাঁচটি। যার মধ্যে এই নতুন 'লেপার্ডাস টিলকায়ো' অন্যতম। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিস্তৃত এই ছোট বিড়ালগুলো বাঘ বা সিংহের মতো বড় প্রজাতির তুলনায় মানুষের মনোযোগ খুব কম পায়।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ড. ক্যারোলিন সার্টর মনে করেন, প্রজাতিটি সংরক্ষণের জন্য এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের আবাসস্থল জানা না থাকলে সুরক্ষা প্রদান অসম্ভব। এই আবিষ্কারের ফলে পুরো বিড়াল পরিবারের (ফেলিডি গোত্র) প্রজাতির সংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে। আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ৪১টি প্রজাতি স্বীকৃত থাকলেও, নতুন এই প্রজাতি এবং টাইগার ক্যাটের অন্যান্য স্বতন্ত্র উপপ্রজাতির প্রমাণের ফলে এই সংখ্যা ৪৪ বা তারও বেশি হতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশা, এর ফলে বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।