প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব বাঁশ দিবস। ২০০৯ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত অষ্টম বিশ্ব বাঁশ সম্মেলনে 'ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন' (WBO) এই দিবসের ঘোষণা দেয়। মূলত পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতে বাঁশের বহুমুখী উপযোগিতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করাই এই দিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য।
প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল এবং নবায়নযোগ্য একটি সম্পদ। প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করার ক্ষমতার পাশাপাশি এর গভীর শিকড় মাটির ক্ষয় রোধ করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক। এছাড়া প্লাস্টিক ও কাঠের পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বাঁশের পচনশীল পণ্যগুলো টেকসই জীবনযাপনের পথ প্রশস্ত করে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাঁশ ব্যাপক সুযোগ তৈরি করে। টেক্সটাইল শিল্প, নির্মাণসামগ্রী, হস্তশিল্প এবং খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে বাঁশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বর্তমানে আসবাবপত্র, হোম ডেকোর এবং জানালার ব্লাইন্ড হিসেবে বাঁশের ইকো-ফ্রেন্ডলি পণ্যের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তবে এসব পণ্য দীর্ঘস্থায়ী করতে সঠিক উপায়ে জাগ দেওয়া, শুকানো এবং সিজন করা প্রয়োজন। এছাড়া স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য বাড়াতে ভার্নিশ বা পেইন্ট ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশি জীবনযাপনে বাঁশের প্রভাব অপরিসীম। নির্মাণ কাজে বিশেষ করে দালান ও অবকাঠামোর স্কাফোল্ডিং তৈরিতে বাঁশের কোনো বিকল্প নেই। গ্রামীণ এলাকায় ঘরবাড়ি নির্মাণ, বেড়া তৈরি এবং সাঁকো বানাতে বাঁশ ব্যবহৃত হয়। কৃষি কাজে লাউ, শসা বা চিচিঙ্গার জাংলা হিসেবেও এটি অপরিহার্য। দেশে প্রায় ৪২ প্রজাতির বাঁশ জন্মায়, যার মধ্যে মুলি বাঁশ ও মোটা বুদুম বাঁশ বেশ পরিচিত। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় বাঁশের গুরুত্ব আরও বেশি; টং ঘর থেকে শুরু করে রান্নার তৈজসপত্র এবং পাহাড়ি পথে চলাচলের লাঠি হিসেবে তারা এর ওপর নির্ভরশীল।
খাদ্যতালিকায় বাঁশের ব্যবহার এখন বেশ জনপ্রিয়। কচি বাঁশকোড়ল বা ব্যাম্বু শুট ওরিয়েন্টাল রান্নায় জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি এখন দেশীয় খাদ্যতালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে। ব্যাম্বু চিকেন, ব্যাম্বু বিরিয়ানি এবং বাঁশের ফোকরে বিন্নি ভাত রান্নার প্রচলন বেড়েছে। এমনকি স্বাস্থ্যগুণসম্পন্ন বাঁশপাতার চাও এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, ঘর সাজানোর জন্য 'লাকি ব্যাম্বু' একটি জনপ্রিয় ইনডোর প্ল্যান্ট, যাকে চাইনিজ সংস্কৃতিতে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়।
তবে বাংলা ভাষায় 'বাঁশ খাওয়া' বা 'বাঁশ দেওয়া' শব্দবন্ধটি প্রতিকূলতা বা প্রতারিত হওয়ার নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হলেও, বাস্তব জীবনে বাঁশ আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। তবে এই উপকারী সম্পদটি যেন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে সহিংসতা বা মৃত্যুর কারণ না হয়, সেই কামনাই থাকে বিশ্ব বাঁশ দিবসে।




