বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের বাজারে তাদের ভোক্তা বা খুচরা (রিটেইল) ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং ক্রেডিট কার্ড সেবা বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। দীর্ঘ ১৭৩ বছরের পুরনো এই ব্যাংকের এই অংশটি অধিগ্রহণ করতে প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি ব্যাংক—ব্র্যাক ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংক। ইতিমধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে এই বিষয়ে পৃথক আলোচনা ও সভা সম্পন্ন করেছে তারা। এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আঞ্চলিক ও প্রধান কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিষয়টি জানাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট তিন ব্যাংকের সূত্র থেকে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে, যদিও আনুষ্ঠানিক চুক্তির অভাবে আগ্রহী ব্যাংকগুলো এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কিছু জানাতে রাজি হয়নি।
জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশে তাদের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরপরই কয়েকটি স্থানীয় ব্যাংক এই অংশটি কেনার আগ্রহ দেখায়, তবে বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে এইচএসবিসি (HSBC) বাংলাদেশে তাদের রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করেছে এবং ২০০৫ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক দেশ থেকে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছিল।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই সিদ্ধান্ত তাদের বৈশ্বিক কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হতে পারে। এর আগে তারা অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, জর্ডান, লেবানন এবং জিম্বাবুয়েসহ বেশ কিছু দেশ থেকে স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করেছে। তানজানিয়া ও আইভরি কোস্টে তারা কেবল করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং চালু রেখে কনজ্যুমার ও বিজনেস ব্যাংকিং থেকে সরে এসেছে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কায় তারা রিটেইল ব্যাংকিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছে।
বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল খাতের আমানত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং বিপরীতে ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির সেবাসমূহের মধ্যে রয়েছে স্মার্ট ও চলতি হিসাব, স্থায়ী আমানত, বৈদেশিক মুদ্রা আমানত এবং প্রিমিয়াম ক্রেডিট কার্ড। এছাড়া তারা পার্সোনাল লোন, অটো লোন ও দীর্ঘমেয়াদি হোম লোনের পাশাপাশি 'সাদিক ইসলামিক ব্যাংকিং'-এর অধীনে সুদবিহীন ডিপিএস ও ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড সেবা প্রদান করে। প্রবাসীদের জন্য তাদের বিশেষ 'স্বদেশী ব্যাংকিং' সেবাও রয়েছে।
সিটি ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল খাতের আমানতের খরচ অত্যন্ত কম, যা অধিগ্রহণ করা গেলে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং আর্থিক সূচকে ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। সিটি ব্যাংকের বর্তমান ব্যক্তিগত আমানত ৪৫ হাজার কোটি টাকা এবং ভোক্তা ঋণ ১২ হাজার কোটি টাকা; এই অধিগ্রহণ সফল হলে তাদের ঋণ স্থিতি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যক্তি আমানত ৫৩ হাজার কোটি টাকা এবং ভোক্তা ঋণ ১৪ হাজার কোটি টাকা। তবে উভয় ব্যাংকই জানিয়েছে যে, এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং মূল্য নির্ধারণসহ নানা অনুমোদনের প্রয়োজন থাকায় সময়সাপেক্ষ হবে।
এই পুরো বিষয়টি নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তারা বাজারের কোনো জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে মন্তব্য করেন না। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড একটি বৈশ্বিক ব্যাংক হিসেবে নিয়মিত তাদের ব্যবসায়িক মডেল মূল্যায়ন করে এবং গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে সম্পদ কেন্দ্রীয়করণের পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রতি ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি ও শক্তিশালী উপস্থিতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।




