কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহী কবি বা সংগীতস্রষ্টাই ছিলেন না, বরং বাংলা সিনেমার দৃশ্যতত্ত্ব এবং সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা নির্মাণেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক। ১৯৩০-এর দশকে বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে তিনি প্রথাগত থিয়েট্রিক্যাল অতি-নাটকীয়তা এবং গল্পের মাঝপথে অপ্রাসঙ্গিক গানের ব্যবহারের রীতিটি বাতিল করে এক নতুন সিনেমাটিক ভাষার সূচনা করেন। নজরুলের মতে, চলচ্চিত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল সংলাপের অলঙ্কারে নয়, বরং নীরবতা, আবহসংগীত এবং দৃশ্য রূপায়ণের সমন্বয়ে চরিত্রের অন্তরের দহন ফুটিয়ে তোলার মধ্যে নিহিত। এই ভাবনা থেকেই তিনি পার্সি মালিকানাধীন ম্যাডান থিয়েটার্সে মিউজিক ডিরেক্টর বা ‘সুর ভাঙারি’ হিসেবে যোগ দেন এবং অভিনয় ও স্পষ্ট উচ্চারণের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩১ সালে ‘জামাইষষ্ঠী’ ও ‘জলসা’ চলচ্চিত্রে সংগীত ও আবৃত্তির পাশাপাশি ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্রের যৌথ পরিচালনা ও অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সিনেমার কৃত্রিমতা ভাঙার কাজ শুরু করেন।
১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পৌরাণিক ছবি ‘ধ্রুব’-এ নজরুলের অবদান ছিল অত্যন্ত সাহসী। এই ছবির ১৮টি গানের সুরারোপ ও স্বকণ্ঠে গাওয়ার পাশাপাশি তিনি ‘দেবর্ষি নারদ’ চরিত্রে অভিনয় করেন। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী নারদের চরিত্রটি ছিল জটাধারী ও প্রবীণ, কিন্তু নজরুল সেই ধারণা বদলে দিয়ে এক প্রাণবন্ত ও সুদর্শন যুবকের বেশে পর্দায় হাজির হন। রক্ষণশীল সমাজের সমালোচনার মুখে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান যে, তিনি নারদের চিরতরুণ ও সুন্দর রূপটিই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। ব্রিটিশ আমলের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সময়ে তিনি পৌরাণিক গল্পের আড়ালে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের দর্শন রোপণ করেছিলেন। তবে সম্মানী নিয়ে প্রতারণার কারণে ১৯৩৪ সালেই তিনি ম্যাডান থিয়েটার্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার পরিচালিত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রে নজরুল ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় প্রথমবারের মতো শ্রমজীবী শ্রেণির বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করেন। তৎকালীন সিনেমা যখন ড্রয়িংরুমের মেলোড্রামায় সীমাবদ্ধ, তখন নজরুল খনি শ্রমিকদের অমানবিক জীবন ফুটিয়ে তুলতে খনির গভীরে নেমে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর এই নির্মাণশৈলী ১৯৪০-এর দশকের ইতালীয় ‘নিউরিয়ালিজম’ বা সত্যজিৎ ও মৃণাল সেনের ‘বেঙ্গল রিয়ালিজম’-এর চেয়েও অনেক বেশি অগ্রগামী ছিল। তিনি অভিজাত সুরের বদলে খনি শ্রমিকদের স্থানীয় ‘ঝুমুর’ সুর এবং হাতুড়ির যান্ত্রিক শব্দকে সাউন্ডস্কেপে ব্যবহার করে শোষিত মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করেন।
পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে ‘বিদ্যাপতি’ চলচ্চিত্রে তিনি আধ্যাত্মিক ভক্তিকে মনস্তাত্ত্বিক রূপ দেন, যেখানে সংলাপের নীরবতা এবং সুরের মাধ্যমে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপান্তরে সংগীত পরিচালকের দায়িত্বে থেকে তিনি অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটান। রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারের জন্য তিনি সরাসরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুমতি নেন এবং তার সঙ্গে বন্দে মাতরম ও নিজস্ব বৈপ্লবিক সুরের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ছবিটিকে একটি রাজনৈতিক দলিলে পরিণত করেন। ১৯৩৯ সালে ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের গল্প, চিত্রনাট্য ও সুরারোপ করেন নজরুল। এখানে তিনি প্রান্তিক বেদেবহরের জীবন ও লোকসুরকে মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় স্থান দেন, যা ছবিটিকে এক সামাজিক-নৃবিজ্ঞানগত গুরুত্ব প্রদান করে।
১৯৪১ সালে ‘নন্দিনী’ ছবিতে নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক সংকট ফুটিয়ে তুলতে তিনি জটিল রাগাশ্রয়ী সুরের প্রয়োগ করেন। অসুস্থতার আগে ‘মদিনা’, ‘চৌরঙ্গী’ ও ‘দিলরুবার’ ছবির কাজ ছিল তাঁর শেষ সক্রিয় সংগ্রাম। নজরুলের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল তাঁর ‘সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ’। তিনি শাস্ত্রীয় রাগসংগীত, ফারসি গজল, কীর্তন, শ্যামাসংগীত, বাউল এবং পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রেশনের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটান। বিশেষ করে ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্টে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি ওয়েস্টার্ন মার্চিং টিউন ও ইউরোপীয় ব্রাস ও পিয়ানোর ছন্দকে চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন। তাঁর এই বৈচিত্র্যময় সুরের সহাবস্থান কেবল সংগীতের ফিউশন ছিল না, বরং তা ছিল ঔপনিবেশিক ভারত ও সামন্ততান্ত্রিক অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে এক সাউন্ড-বিপ্লব। নজরুল প্রমাণ করেছিলেন যে, সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী নান্দনিক হাতিয়ার।



