বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণার তথ্যে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক চিত্র ধরা পড়েছে। এতে দেখা গেছে, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেহে চার ধরনের পরজীবী বা প্যারাসাইটের সংক্রমণ ঘটছে। শুধু বাঘই নয়, বাঘ যেসব প্রাণী শিকার করে—যেমন হরিণ, বন্য শূকর এবং বানর—তাদের দেহেও একই ধরনের পরজীবীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষক দলটির নেতৃত্বদানকারী সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান আহমেদ এই পরজীবীগুলোকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করে ব্যাখ্যা করেন, এগুলো সরাসরি মৃত্যুর কারণ না হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাঘকে চরম দুর্বল করে ফেলতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘শরীরে পরজীবীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বাঘ দুর্বল হবে। এই দুর্বলতা তার শিকার ধরার ক্ষমতা কমাবে এবং অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করবে।’ তদন্তে ৬৮.৫ শতাংশ বাঘের মধ্যে ফিতাকৃমির সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে, এরপরেই ৫৩ শতাংশ ক্ষেত্রে গোলকৃমির সংক্রমণ ধরা পড়ে। এ ছাড়াও পাতাকৃমি ও এককোষী পরজীবীর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা গিয়েছে।

গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইসিডিডিআর,বি-এর পাঁচজন গবেষক। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত একাধিক ধাপে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি স্থান থেকে বাঘ ও অন্যান্য বন্য প্রাণীর মল ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে মোট ৩৯৯টি প্রাণীর নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।

এই সংক্রমণ কীভাবে ছড়াচ্ছে, তার একটি ধারাবাহিক চক্র ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক সুলতান জানান, শামুকের দেহে অবস্থিত লিভার ফ্লুক নামক পরজীবী প্রথমে ঘাসে স্থান নেয়। সেই ঘাস খাওয়ার মাধ্যমে হরিণের দেহে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে যখন বাঘ সেই হরিণ শিকার করে, তখন পরজীবীটি সুস্থ হয়ে বাঘের অন্ত্রে চলে যায়। এভাবে সংক্রমণ অব্যাহত থাকে। মানুষের ও গবাদিপশুর মলমূত্রও সুন্দরবনে পরজীবী বিস্তারের একটি মাধ্যম হতে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরজীবীগুলো বাঘের পরিপাকতন্ত্রে বসবাস করে খাদ্যের পুষ্টি শোষণ করে নেয়। ফলস্বরূপ বাঘ অপুষ্টিতে ভুগতে পারে, ওজন কমে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এর ফলে প্রজননক্ষমতা ও শাবকের বেঁচে থাকার হারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। অধ্যায়ক সুলতান আহমেদ আরও জানান, বাঘের মলে টক্সোকেরা ক্যাটি নামক এক ভয়ানক পরজীবী পাওয়া গেছে, যা বাঘের বাচ্চার মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া এনসাইক্লোসটমা সিয়ালেনিকাম প্রজাতির কৃমি অন্ত্র থেকে রক্ত শুষে ডায়রিয়া ঘটায়, এবং ট্রেমাটোড গ্রুপের লিভার ফ্লুক বাঘের লিভারে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে পারে।

গবেষকদের আরও একটি বড় উদ্বেগের কারণ হলো ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাস। সুন্দরবনের আশপাশের অঞ্চলের কুকুরের রক্তে এ ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছ। যদিও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাঘের সঙ্গে কুকুরের সরাসরি সংস্পর্শের সম্ভাবনা নেই, তবুও ঝুঁকি এড়াতে বনসংলগ্ন এক কিলোমিটার এলাকা থেকে সব কুকুর সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ মনে করেন, বাঘ সংরক্ষণ ও প্রিজন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দেবে। তার মতে, ‘গবেষণার প্রাপ্ত তথ্যকে কাজে লাগিয়ে বাঘের ওপর এই হুমকি কীভাবে কমানো যায়, এখন সেই কৌশল নির্ধারণের সময় এসেছে।’ উল্লেখ্য, ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষ্যে এবার বাংলাদেশে প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’।