মহাকাশে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট পাঠানোর এই প্রতিযোগিতার শুরুটা প্রায় সাত বছর আগে। ২০১৯ সালে টেক্সাসভিত্তিক কোম্পানি স্পেসএক্স তাদের স্টারলিংক প্রকল্পের আওতায় এক ধাপে ৬০টি স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠানোর মধ্য দিয়ে এই দৌড় শুরু হয়। কানাডার রেজিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সামান্থা ললার তখন কানাডার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে খামার পরিচালনার জন্য পাড়ি জমান। রাতের আকাশে নক্ষত্রের সেই মনোরম দৃশ্য দেখতে পাবেন বলে তিনি আশা করেছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় যখন দেখতে পান, কৃত্রিম স্যাটেলাইটগুলো ক্রমে তার সেই তারাভরা আকাশ দখল করে নিচ্ছে। শহর থেকে দূরে থাকা মানুষের কাছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত এসব স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হচ্ছে।

গত মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সের সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে এই কোম্পানির ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা এখন এক কোটির বেশি। তবে এ খাতে এককভাবে এগিয়ে নেই স্পেসএক্সই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ নতুন স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর পরিকল্পনা চলমান। এই পরিকল্পনার সামান্য অংশ বাস্তবায়িত হলেও পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা বর্তমান ১৫ হাজার স্যাটেলাইটের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে নগণ্য হয়ে পড়বে।

সুবিধার দিকটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। দুর্গম এলাকায় এখন দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট পৌঁছে যাচ্ছে। গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজ কিংবা উড়ন্ত অবস্থায় থাকা যাত্রীবাহী বিমানেও ব্রডব্যান্ড সংযোগ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও উদ্ধারকারী দলগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যেতে পারছে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে দূর থেকে ড্রোন নিয়ন্ত্রণেও স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর কক্ষপথ ঠিক কতগুলো স্যাটেলাইট ধারণ করতে পারবে? এর কোনো নির্দিষ্ট সীমা আছে কি না, তা নিয়ে এখন গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক জিওভান্নি লাভেজ্জির মতে, এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার স্যাটেলাইট ব্যবস্থাপনা ভালোভাবেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সীমাকে কতদূর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা লো-আর্থ অরবিট নামে পরিচিত। ২০২২ সালের একটি গবেষণা বলেছিল, ২০০ থেকে ৯০০ কিলোমিটার উচ্চতার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ মহাকাশযান রাখা সম্ভব। তবে সেই হিসাবে ধরে নেওয়া হয়েছিল স্যাটেলাইটগুলো নিখুঁত নিয়মে পরিচালিত হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়। এরপর ২০২৪ সালে আরও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণে দেখা যায়, কক্ষপথের ধারণক্ষমতা ১ কোটি থেকে ১০ কোটির মধ্যে যেকোনো সংখ্যা হতে পারে। এত বড় তারতম্যের কারণে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে মানবদেহের ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের মহাকাশ বর্জ্য বিশেষজ্ঞ হিউ লুইস বলেন, কক্ষপথের ধারণক্ষমতা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর—যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার হার, সংঘর্ষ এড়ানোর কৌশল এবং বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিরোধ। গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে ওপরের বায়ুমণ্ডল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, ফলে বাতাসের ঘনত্ব কমে স্যাটেলাইটের ওপর প্রাকৃতিক বাধাও কমে যাচ্ছে। এর ফলে মহাকাশের আবর্জনা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যাওয়ার আগে অনেক বেশি সময় ধরে কক্ষপথে অবস্থান করবে। লুইসের মতে, আমরা ইতিমধ্যেই নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি বস্তু মহাকাশে পাঠিয়ে ফেলেছি। তিনি কেসলার সিনড্রোমের কথা উল্লেখ করে বলেন, ৫৫০ কিলোমিটারের ওপরের কক্ষপথে স্যাটেলাইটের সংখ্যা এত বেশি যে, আজ যদি সব রকেট উৎক্ষেপণ বন্ধও করে দেওয়া হয়, তবুও টুকরোগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আবর্জনার পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।

এদিকে উৎক্ষেপণের হার কিন্তু কমছে না। গত বছর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হয়েছে, আর এ বছর সেই রেকর্ডও ভাঙতে চলেছে। ২০২৬ সালে কেবল চীন সরকারই ২ লাখ নতুন স্যাটেলাইটের অনুমোদন চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টারক্লাউড চেয়েছে ৮৮ হাজার এবং ব্লু অরিজিন চেয়েছে ৫১ হাজার স্যাটেলাইট পাঠানোর অনুমতি। গত জানুয়ারিতে স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক মহাকাশে ১০ লাখ ডেটা-সেন্টার স্যাটেলাইট বসানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ওয়াশিংটন ডিসির স্যাটেলাইট রেগুলেশন বিশেষজ্ঞ রুথ প্রিচার্ড-কেলি অবশ্য মনে করেন, এটি কোম্পানির ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ভ্যালুয়েশন ধরে রাখার জন্য একটি ব্যবসায়িক কৌশল হতে পারে। তবে এই সংখ্যার সামান্য অংশও যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আকাশ আক্ষরিক অর্থেই স্যাটেলাইটে ভরে যাবে।

এই ঝুঁকির বাস্তব প্রমাণ মিলেছে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। স্পেসএক্সের এক রিপোর্টে বলা হয়, আগের বছর গ্রীষ্মে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের আড়াই কেজি ওজনের একটি জ্বলন্ত টুকরো কানাডার সাসকাচোয়ানের এক খামারির জমিতে পড়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী সামান্থা ললার সেই খামারির কাছ থেকে জানতে পারেন, ঘটনাটি তার বাড়ি থেকে মাত্র তিন ঘণ্টার দূরত্বে ঘটেছে। এটি প্রমাণ করে, মহাকাশ থেকে আবর্জনা পৃথিবীতে এসে পড়ার ঝুঁকি কম নয়। ২০২৭ সালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ড্রাকো মিশন মহাকাশ থেকে খসে পড়া বস্তুর এই জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গভীর গবেষণা করবে।

স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকিও এখন বিশাল উদ্বেগের কারণ। ২০০৯ সালে মার্কিন ও বাতিল রুশ স্যাটেলাইটের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয়, যার ফলে তৈরি হওয়া ২ হাজারের বেশি টুকরোর অর্ধেক আজও মহাকাশে ঘুরছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গবেষক স্টিন লেমেনস মনে করেন, আরেকটি বড় সংঘর্ষ হওয়াটা শুধু সময়ের ব্যাপার। ক্যালিফোর্নিয়ার লিওনল্যাবসের বিশেষজ্ঞ ড্যারেন ম্যাকনাইটের হিসাব অনুযায়ী, ৮৪০ এবং ৯৭৫ কিলোমিটার উচ্চতায় স্কুল বাসের আকারের অসংখ্য বাতিল রকেটের অংশ ভেসে বেড়াচ্ছে, যেখানে এ বছরই একটি বড় সংঘর্ষের আশঙ্কা ২৯ শতাংশ। সংঘর্ষ এড়াতে বর্তমানে স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলোকে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার বার নিজেদের পথ পরিবর্তন করতে হয়। প্রতিটি স্যাটেলাইট প্রতি ১০ মিনিট অন্তর তার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার যাত্রাপথ হিসাব করে মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। এমনকি ৩ কোটিতে ১ ভাগ ঝুঁকি থাকলেও স্যাটেলাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে থ্রাস্টার চালু করে দিক পরিবর্তন করে। স্পেসএক্স গত বছর প্রায় ৩ লাখ বার এমন সংঘর্ষ এড়িয়েছে। কিন্তু স্পেসএক্স যদি সত্যিই ১০ লাখ স্যাটেলাইট পাঠায়, তবে বছরে ১০০ কোটি বার এই পথ পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে, যা যেকোনো ব্যবস্থার জন্য অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

১৯৬৭ সালের মহাকাশ আইন অনুযায়ী মহাকাশের কোনো অংশ কেউ দখল করতে পারবে না। কিন্তু কক্ষপথের সবচেয়ে ভালো জায়গাগুলো (৩৫০ থেকে ৫৫০ কিলোমিটার) নিয়ে এখন কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশনস ইউনিয়ন রেডিও স্পেকট্রাম বরাদ্দের বিষয়টি দেখলেও বিশাল চাপের সঙ্গে তারা তাল মেলাতে পারছে না। ২০২৭ সালের অক্টোবরে চীনের সাংহাইয়ে তাদের বড় সম্মেলনে কক্ষপথের নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। স্যাটেলাইটের এই আধিক্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশে ৫ লাখ স্যাটেলাইট থাকলে পৃথিবীর যেকোনো টেলিস্কোপের ছবিতে স্যাটেলাইটের দাগ চলে আসবে। আর সংখ্যাটি ১০ লাখে পৌঁছালে রাতের আকাশে তারার চেয়ে স্যাটেলাইটই বেশি দেখা যাবে। সামান্থা ললার আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা আর মহাকাশ গবেষণাই করতে পারব না!’ তার দলের তৈরি ক্র্যাশ ক্লক অনুযায়ী, মহাকাশের সব স্যাটেলাইট হঠাৎ অকেজো হয়ে গেলে তিন দিনেরও কম সময়ের মধ্যে স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হবে। ফলে বর্তমানে থাকা স্যাটেলাইটের সংখ্যাই হয়তো কক্ষপথের চূড়ান্ত সীমা, লাখ লাখ নয়।