বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দাবি করেছেন, তার দল বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন আপস করেনি। তিনি বলেন, 'আমরা কারও সঙ্গে রাতের বেলা তলেতলে আপস করিনি এবং দিনের বেলা গিয়ে রাস্তায় নেমে চিৎকার দিইনি। স্বৈরাচারের অনুমতি নিয়েও আমরা রাস্তায় নামিনি।' বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) কাউন্সিল হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ শাখা এই সভার আয়োজন করে।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের শুরু থেকেই জামায়াতের পূর্ণ সমর্থন ছিল। তবে সরকার যখন জামায়াত নিষিদ্ধ করে, তখন দলের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—হয় মরতে হবে, নয়তো বাঁচার মতো বাঁচতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু দলের শীর্ষ নেতারা সে সময় বলেছিলেন, আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু জামায়াত একই দিনে দেশবাসী ও নেতা-কর্মীদের তরুণ সমাজের পাশে দাঁড়াতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিল।

জামায়াত তার কৃতিত্ব নিতে চায়নি জানিয়ে আমির বলেন, জামায়াতের এতজন শহীদ হলেও দলের কেউ আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ছিল—এ কথা তারা বলেনি। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কিছু লোক চাঁদাবাজিতে ঝাঁপিয়ে পড়লে জামায়াত তাদের শীর্ষস্থানীয় দুজন নেতার সঙ্গে আলোচনায় বসে চাঁদাবাজি থামাতে অনুরোধ করে। কিন্তু তাদের কথা ভালো লাগেনি। 'শর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে তাড়ানো যায় না' বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের পরও সেই কোটা এখন 'নিকৃষ্টভাবে' বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, জেলা পরিষদের প্রশাসক, ব্যাংক, বীমা কর্পোরেশন—সব প্রতিষ্ঠানে 'নির্লজ্জ দলীয়করণ' শুরু হয়েছে। 'দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য কায়েম করতে যোগ্য লোকদের সরিয়ে বাছাই করে অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণদের প্রধান প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে,' বলেন তিনি।

জুলাই যোদ্ধারা সিস্টেম পরিবর্তনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, 'দেশ এখন আবার অন্ধকার গলির দিকে ঢুকে যাচ্ছে।' জামায়াত সেই অন্ধকার গলিতে হাঁটবে না—তারা সংসদে শহীদদের ও জনগণের পক্ষে কথা বলবে। তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, 'এ দেশে কোনো হত্যার বিচার ২১ বছর, ৫০ বছর পরও হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের হত্যার বিচারও যত সময় লাগুক, হতেই হবে।'

সভায় বিশেষ অতিথি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তিল পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না। সংসদে এর সমাধান না হলে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের দিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, 'গণভোটকে ধারণ করুন। তাহলে বিএনপি দেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী অবস্থান করে নেবে।' সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম সময়, কারণ কেউ পালিয়ে যুদ্ধ করেনি, বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করেছিল।

সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ও জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম বলেন, ট্রাইব্যুনালের অভাবে জুলাই গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিত হচ্ছে না। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, 'যারা জুলাইকে মুছে দিতে চায়, তাদের ইতিহাস থেকে মুছে দিতে হবে।' শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান সরকারকে বিগত দিনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার আহ্বান জানান। অন্যথায় 'আগের মতো একই পরিণতি ভোগ করতে হবে' বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আন্দোলনের সময় মাকে লেখা শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের চিঠি পড়ে শোনান তাঁর নানা মো. সাঈদুর রহমান। তিনি বলেন, 'যে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আনাস জীবন দিয়েছিল, সেই ন্যায় এখনো বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।' সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল। সঞ্চালক ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন ও ফখরুদ্দিন মানিক। আরও বক্তব্য দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক সচিব মাহবুবুল হক, আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস।