জ্যামিতির জগতে এক চিরন্তন ধারণা ছিল—যেকোনো নিখুঁত চিত্র আঁকতে রুলার ও কম্পাস দুটোই অপরিহার্য। কিন্তু ১৭৯৭ সালে এক ইতালীয় গণিতবিদের হাত ধরে এই ধারণা ভেঙে পড়ে। ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে উৎসর্গ করা একটি বইয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, রুলার ছাড়াই শুধু কম্পাসের সাহায্যে সব জ্যামিতিক কাজ সম্পন্ন করা যায়। বইটির নাম ‘জিওমেট্রিয়া ডেল কম্পাসো’ বা ‘কম্পাসের জ্যামিতি’। এর লেখক লরেঞ্জো মাসকেরোনি।

১৭৫০ সালে ইতালির বেরগামো শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে মাসকেরোনির জন্ম। পরিবারের ইচ্ছায় তিনি পাদ্রি হন, কিন্তু তাঁর মন পড়ে ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে। ১৭৭৮ সালে বেরগামোর সেমিনারিতে এসব বিষয় পড়ানো শুরু করেন। তীক্ষ্ণ মেধার কারণে অচিরেই ডাক পান পাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং ১৭৮৯ সালে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর নির্বাচিত হন।

মাসকেরোনি শুধু গণিতজ্ঞই ছিলেন না, ছিলেন এক অসাধারণ কবি। ইতালির আর্কেডিয়ান একাডেমির সদস্য হিসেবে তাঁর লেখা ‘ইনভিটো ডি দাফনি আ লেসবিয়া সিডোনিয়া’ কবিতাটি সাহিত্যমহলে আলোড়ন তোলে। গণিতের নিরস সমীকরণ আর কবিতার কোমল ছন্দের এ মিলন ছিল বিরল।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ ‘জিওমেট্রিয়া ডেল কম্পাসো’ প্রকাশের পর তিনি সেটি নেপোলিয়নকে উৎসর্গ করেন। নেপোলিয়ন নিজেও একজন শৌখিন গণিতবিদ ছিলেন। মাসকেরোনির সঙ্গে তাঁর প্রায়ই গাণিতিক আলোচনা হতো। ইতিহাসবিদরা জানান, নেপোলিয়ন একবার ‘নেপোলিয়নের সমস্যা’ নামে পরিচিত একটি জটিল জ্যামিতিক ধাঁধা সমাধান করতে দেন। মাসকেরোনি শুধু কম্পাস দিয়ে তার এমন চমৎকার সমাধান করেন যে নেপোলিয়ন বিস্মিত হন। এই কৃতিত্বের জন্য মাসকেরোনি পাডুয়া একাডেমি, ইতালীয় বিজ্ঞান সোসাইটি ও মান্টুয়া একাডেমির সদস্যপদ লাভ করেন।

কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস এখানেই লুকিয়ে। মাসকেরোনি জানতেন না যে তাঁর আবিষ্কারের ঠিক ১২৫ বছর আগে ড্যানিশ গণিতবিদ জর্জ মোর ১৬৭২ সালে ‘ইউক্লিডেস ড্যানিকাস’ নামের বইয়ে একই বিষয় প্রমাণ করে গেছেন। মোরের বইটি কালের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল, ১৯২৮ সালে হঠাৎ এক বইয়ের দোকানে আবিষ্কৃত হয়। ততদিনে ‘মাসকেরোনি কনস্ট্রাকশন’ নামটি জ্যামিতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে। তবে মাসকেরোনির প্রমাণের কৌশল ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তাই গণিতবিদেরা তাঁকেও কৃতিত্ব দেন।

মাসকেরোনির যুক্তি ছিল সরলরেখা আসলে অসংখ্য বিন্দুর সমষ্টি। কম্পাস দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিন্দু খুঁজে বের করা গেলে সেগুলোই সরলরেখার প্রতিনিধিত্ব করবে; কাগজে দাগ টানার প্রয়োজন নেই। তিনি বৃত্তের পর বৃত্ত এঁকে, সমদ্বিবাহু ও সমবাহু ত্রিভুজের বৈশিষ্ট্য এবং পিথাগোরাসের উপপাদ্য কাজে লাগিয়ে এমন বিন্দু নির্ধারণ করেন, যা দিয়ে স্কেল ছাড়াই সরলরেখার ধারণা পাওয়া যায়। এটি ছিল এক গাণিতিক বিপ্লব।

১৭৯৫ সালে ফ্রান্সে মেট্রিক পদ্ধতি চালু হলে মিলান সরকার মাসকেরোনিকে প্যারিসে পাঠায় নতুন পরিমাপ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার জন্য। ১৭৯৮ সালে তিনি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। কিন্তু ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি আর ইতালিতে ফিরতে পারেননি। প্যারিসের বৈরী আবহাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৮০০ সালের ১৪ জুলাই, বাস্তিল দিবসের উৎসবের দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জর্জ মোর আগেই আবিষ্কার করলেও মাসকেরোনি নিজস্ব মেধা ও গাণিতিক সৌন্দর্য দিয়ে জ্যামিতির জগতে যে অবদান রেখেছেন, তা চিরস্মরণীয়। রুলার ছাড়া জ্যামিতি আঁকার এই কৌশল প্রমাণ করে দেয়, সীমিত উপকরণের মধ্যেও মানুষের কল্পনাশক্তি অসাধ্য সাধন করতে পারে।