কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবার (বালক) থেকে সম্প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তাদের বয়স ১৮ বছর অতিক্রম করায় সমাজসেবা কার্যালয়ের নিয়মানুযায়ী আর সেখানে রাখা সম্ভব হয়নি। এই পাঁচজনের মধ্যে রয়েছেন আলফাজ হোসেন, আকাশ শেখ, আকাশ ইসলাম, তুষার আহম্মেদ ও অভি হাসান। সকলেই বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে হঠাৎ করে আশ্রয় হারানোর ফলে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

আলফাজ হোসেনের বাবা মারা যাওয়ার পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ২০১২ সালে স্বজনেরা তাকে কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবারে রেখে যান। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। সোমবার তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আলফাজ জানান, তিনি আরও পড়তে চান এবং থাকার জায়গার ব্যবস্থা চান। বাধ্য হয়ে তিনি বড় ভাইয়ের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।

আকাশ শেখের বাবা ২০১১ সালে মারা যান। দারিদ্র্যের কারণে এক আত্মীয় তাকে শিশু পরিবারে ভর্তি করে দেন। সেখান থেকে তিনি ২০২১ সালে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৮৯ এবং ২০২৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৪ অর্জন করেন। বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন। আগামী ২৭ জুলাই তার প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। ঠিক পরীক্ষার আগে ছাড়পত্র পাওয়ায় তিনি পড়েছেন বিপাকে। পরিবারে মা ও বড় ভাই থাকলেও বড় ভাই ভাঙারি ব্যবসা করে সংসার চালান। আকাশের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা বাড়ছে।

আকাশ ইসলামের বাবা মারা যান তার এক বছর বয়সে। মা ছেড়ে চলে যাওয়ায় চার বছর বয়সে ২০০৭ সালের অক্টোবরে তার ফুফু তাকে কুষ্টিয়া শিশু পরিবারে দিয়ে যান। তিনি ২০২১ সালে এসএসসি ও ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তারও পরীক্ষা ২৭ জুলাই থেকে শুরু হবে। দাদা মারা গেছেন, দাদি অসুস্থ। তিনি বেশির ভাগ সময় ফুফুর বাড়িতে থাকেন এবং সেখানেই এখন উঠেছেন। তিনি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চান।

তুষার আহম্মেদ সাত বছর বয়সে বাবা হারিয়ে শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। এখন উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছেন। তিনি বলেছেন, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অভি হাসানও একই সুরে জানান, নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে শিক্ষা ও কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক-২ আবদুল্লাহ আল সামী জানান, পাঁচজনের বয়স ১৮ পেরিয়েছে—কারও কারও দুই থেকে তিন বছর আগে। নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত লালন-পালনের দায়িত্ব থাকলেও মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের আরও কিছুদিন রাখা হয়েছিল। সর্বশেষ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সভা করে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয় এবং সোমবারই আত্মীয়দের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আরও কী করা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, পাঁচজনের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘একটু সময় দিন, একটা ব্যবস্থা হবে। তাদের কর্মসংস্থানের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মানবিক বিবেচনায় পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।