বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পথে। দলটির একাধিক উচ্চপদস্থ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে তাঁর নাম চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্রের সাথে প্রার্থীর লিখিত সম্মতিপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। গত শনিবার মির্জা ফখরুল সেই সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন বলেও জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, মনোনয়ন দাখিলের সময় সংসদ সদস্যদের প্রস্তাব ও সমর্থন ছাড়াও প্রার্থীকে পদে লড়তে এবং দায়িত্ব নিতে সম্মতির ঘোষণা দিতে হয়। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারিত রয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে; আজ সকালে দলটির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী সিইসির দপ্তর থেকে এই ফর্ম সংগ্রহ করেন।
একই প্রার্থীর জন্য একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে ইসি সূত্র জানিয়েছে, সেক্ষেত্রে যেকোনো একটি বৈধ হলেই প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সময়েও দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। গত ২৪ জুলাই সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর পদটি শূন্য হয় এবং স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট হওয়ায় দলের মধ্যে তাঁর উত্তরসূরি নিয়ে নতুন কৌতূহল তৈরি হয়েছে। প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর ২০১৬ সালে জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদে নিযুক্ত হন। দীর্ঘ এই সময়ে, বিশেষ করে খালেদা জিয়ার কারাবন্দি ও তারেক রহমানের নির্বাসনের সময় তিনি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ছয়বার কারাগারেও যান। তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। সূত্রমতে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ দেওয়া হতে পারে, যেখানে রিজভীর সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
অন্যদিকে, বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে বিএনপির সাবেক নেতা ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। রোববার মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে জোটের বৈঠক শেষে এই ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি অনীহা দেখায়, ফলে আলাদা প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে। অলি আহমদ নিজেও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে মনোনয়নের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো অভিযোগ নেই।
জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত, যা গণতন্ত্রের গতি ফিরিয়ে আনবে। দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে এবং জামায়াত গঠনমূলক বিরোধিতার জায়গা তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিশ্চিত পরাজয় জেনেও বিরোধী দলের এই পদক্ষেপ একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে—তারা কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করতে চায়।
আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সদস্য দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার পদ শূন্য হয়। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর মাত্র একবারই রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছে, সেবারও কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। এবার সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ায় ২০ আগস্ট সংসদে ভোট হবে। ইসি ইতোমধ্যে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে এবং ৩৪৯ জন ভোটারের তালিকা প্রকাশ করেছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট, এরপর একাধিক প্রার্থী থাকলে ব্যালট পেপার ছাপা হবে। ভোটগ্রহণের দিন সিইসি সভাপতিত্ব করবেন। এই নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতাই নয়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং বিরোধী জোটের রাজনৈতিক অবস্থান—দুটির জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




