প্রায় তিন দশক ধরে একটি রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তুকে গ্রহাণু বলে চালিয়ে আসছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সম্প্রতি তার প্রকৃত পরিচয় উন্মোচিত হয়েছে। '১৯৯৮ এসএইচ২' নামের ওই বস্তুটি আসলে একটি সুপ্ত অবস্থায় থাকা দুর্বল ধূমকেতু বলে নিশ্চিত হয়েছেন গবেষকরা। নেচার অ্যাস্ট্রোনমি সাময়িকীতে এই চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৯৮ সালে প্রথম শনাক্তের পর বস্তুটির কক্ষপথের কোনো বিকৃতি বা লেজের অনুপস্থিতির কারণে এটি একটি পাথুরে গ্রহাণু বলেই ধরে নেওয়া হয়। পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও কোনো ধূলিকণার মেঘ বা কণাবলি দেখা যায়নি, এবং এর ভ্রমণপথ ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। যখন বস্তুটি আবারও পৃথিবীর নিকটে আসে, তখন গোল্ডস্টোন প্ল্যানেটারি রাডার সিস্টেমের মাধ্যমে এর অবস্থান মাপতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্মিত হন। তারা দেখেন, রহস্যময় বস্তুটি প্রত্যাশিত জায়গা থেকে প্রায় ১৫৩ আর্কসেকেন্ড দূরে অবস্থান করছে। মহাকর্ষ বলের প্রচলিত হিসাব-নিকাশে এর সঠিক অবস্থান নির্ধারণ সম্ভব হচ্ছিল না।

গবেষকরা লক্ষ্য করেন, বস্তুটি একটি অজানা কারণে ক্রমাগতভাবে গতি বৃদ্ধি করছিল। কোনো জ্যোতিষ্কের ওপর তাপ বিকিরণের তারতম্যে যে বল সৃষ্টি হয়, যাকে ইয়ারকোভস্কি প্রভাব বলে, তার চেয়েও ১০ুণ বেশি ত্বরণ পরিমাপ করা হয়। বিজ্ঞানীরা তখন একটি বিকল্প ব্যাখ্যার দিকে মনোনিবেশ করেন। তাদের ধারণা, বস্তুটির অভ্যন্তরের বরফ সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হয়ে বাইরে বেরোবার সময় যে ধাক্কা দেয়, তাতেই গতিপথের এই বিচ্যুতি ঘটে। একই সাথে নির্গত গ্যাস ও ধূলিকণা একটি ফ্যাকাশে লেজের সৃষ্টি করে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডা–ফ্রান্স–হাওয়াই টেলিস্কোপ এই ফ্যাকাশে লেজটি স্পষ্টরূপে শনাক্ত করে। একই সময় বস্তুটিকে বেষ্টন করে থাকা ধূমকেতুর মেঘও ধরা পড়ে। এরপরই রহস্যময় বস্তুটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় 'পি/১৯৯৮ এসএইচ২'।

পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, ধূমকেতুটির কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটেনি। বরং জুলাইয়ে সূর্যের সবচেয়ে কাছে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর এটি ধাপে ধাপে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্রমাগত ধূলিকণা নির্গত করে। বাইরের শক্ত আবরণ ভেদ করে সূর্যের তাপ ভেতরে পৌঁছাতে কিছুটা সময় নেওয়ায় এই প্রতিক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছিল বলে মত দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

এই আবিষ্কারের পর গবেষকদের মতে, মহাকাশে এমন অসংখ্য অন্ধকার ধূমকেতু রয়েছে যারা দেখতে গ্রহাণুর মতো হলেও মহাকর্ষের সাধারণ নিয়ম মেনে চলে না। তাই এদের গতিপথের নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।