জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় ছাত্র প্রতিনিধিরা সরকারে না গেলে সেই সরকারের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ত। বর্তমানে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করা নাহিদ ইসলাম প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভ্যুত্থান-পরবর্তী নানা ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতনের দাবিতে রূপান্তরের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার দিন থেকেই তারা বুঝতে পারেন এই আন্দোলন আর কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওই দিনই আন্দোলনের গতিপথ বদলে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিবি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার কৌশল হিসেবে তারা আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বিবৃতি দিতে রাজি হন। তবে তাদের পরিকল্পনা ছিল বের হয়ে এসে নিজেদের মতো করে বক্তব্য দেওয়ার। ডিবি কর্মকর্তারা তাদের কাছ থেকে ওই ভিডিও নিয়ে তা গণমাধ্যমে ছেড়ে দেয় বলে তিনি জানান।
৩ আগস্ট শহীদ মিনারে এক দফা ঘোষণার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, শুধু শেখ হাসিনার পদত্যাগ নয়, বরং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলোপ চেয়েছিলেন তারা। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে তা চরম আকার ধারণ করেছিল।
‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে ৫ আগস্টে এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কারফিউ জারি ও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের খবর পাওয়ার পর তারা বুঝতে পারেন, আর সময় নষ্ট করলে সরকার প্রস্তুতি নিয়ে নেবে। তাই চূড়ান্ত পদক্ষেপ ৫ আগস্টেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
৫ আগস্ট সকালের ঘটনা বর্ণনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সেদিন তিনি ধানমন্ডির এক শিক্ষকের বাসায় ছিলেন। সেনাবাহিনী শাহবাগ এলাকা থেকে সরে গেলে দুপুর ১২টার দিকে তিনি সেখানে যান। বেলা দেড়টা-দুটার দিকে সাংবাদিকদের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পলায়নের খবর পান। তবে গণভবনে গিয়ে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেননি, কারণ এটিকে শেখ হাসিনার ফাঁদ বলে সন্দেহ করেছিলেন।
৫ আগস্ট রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা জাতীয় সরকার ও সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব দিলে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে কথা বলে। তারেক রহমান তাদের ধন্যবাদ জানান এবং তারা তাকে দেশে ফিরে সবাই মিলে দেশ গড়ার আহ্বান জানান।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ৩ আগস্টের পর থেকেই আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি নিজেও ইউনূসের সাথে কথা বলে দেশের হাল ধরার অনুরোধ জানান। ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ফ্যাসিবাদের ভুক্তভোগী হওয়ায় তাকেই সেরা মনে হয়েছিল বলে জানান নাহিদ ইসলাম।
৬ আগস্ট বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী প্রথাগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়েছিল এবং ইউনূসের আওয়ামীবিরোধী অবস্থানের কারণে তার নামে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে পরে তারা তাদের যুক্তি দিয়ে সেনাবাহিনীকে বোঝাতে সক্ষম হন।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া বর্ণনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তালিকা চূড়ান্ত হয় বিমানবন্দরে অধ্যাপক ইউনূস আসার পর। সেখানে বসেই কিছু নাম বাদ পড়ে এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সব যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের আগে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেননি। অভ্যুত্থানের পর বিএনপিকে যথাযথ গুরুত্ব দিলেও সংস্কার বা পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাবে তারা সাড়া দেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। জুলাই ঘোষণাপত্র ও গণভোট নিয়েও বিএনপি ‘নাটক’ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধান পুনর্লিখনের পরিবর্তে সংস্কার কমিশন করা ‘রং আইডিয়া’ ছিল। সরকারের বড় অর্জন হলো নির্বাচন ও উত্তরণ সম্পন্ন করা, কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। তিনি মনে করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নেই এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী শ্রেণিও পরিবর্তন চায়নি।
শেষ প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিশ্বাস না করে তাদের দ্রুত সংগঠিত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তবে ৫ থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে কোনো বড় ভুল ছিল বলে তিনি মনে করেন না।


