অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নাজুক। তবে এই সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল জাতীয় ঐক্য। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান সম্প্রতি এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও বর্তমান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সমাজের সম্মিলিত উত্থান। এই আন্দোলনের সময় তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল: প্রথমত, জাতীয় ঐক্য আরও শক্তিশালী করা; দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা; এবং তৃতীয়ত, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা। সব মিলিয়ে মানুষ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষক। সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অস্থিরতার মধ্যেও বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে তাদের কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

সরকারের বড় সীমাবদ্ধতা ছিল জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করার বদলে রাষ্ট্র পরিচালনায় অতিরিক্ত আমলানির্ভর হয়ে পড়া। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণকে রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনায় অংশীদার করার বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর ক্রমেই সীমিত করা হয়। কতিপয় উপদেষ্টার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাও সরকারের গতিশীলতা নষ্ট করেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের কাছে দেশের বিভিন্ন খাতের অংশীজনের চেয়ে বিদেশিরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুলাইয়ের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে কয়েকটি প্রশাসনিক শব্দে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। পরিবর্তনের বিস্তৃত সামাজিক ধারণা ক্রমে ‘সংস্কার’ শব্দের মধ্যে আটকে পড়ে। সংস্কারের আলোচনাও সীমিত হয়ে যায় কিছু বিশেষজ্ঞ, বৈঠক ও ‘যমুনা’র ঘেরাটোপে। এসব বিশেষজ্ঞের অনেকে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত নন। ফলে জাতীয় প্রত্যাশা জনপরিসর থেকে ক্রমে প্রশাসনিক আলোচনায় সংকুচিত হয়।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোযোগ ছিল মূলত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকে, যার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, বৈষম্য বা প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরির মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো তুলনামূলকভাবে অন্তরালেই থেকে যায়। অথচ জুলাইয়ের প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতিকে ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা।

বর্তমানে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক মাস পেরিয়েছে। সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আবার চালু হয়েছে, বিরোধী দল সংসদে আছে, অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগও বেড়েছে। এসব ইতিবাচক হলেও জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণের সমার্থক নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি আরও ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে?

নিয়োগ ও পদায়নের মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানো সম্ভব হচ্ছে কি না, সেটিই হবে পরিবর্তনের বড় পরীক্ষা। শিক্ষা ক্ষেত্রেও সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা নিয়ে নানা কমিশন গঠন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণদের শিক্ষামুখিতা হ্রাস। হামে কয়েক শ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্র ও নীতি পরিচালনার ভয়াবহ সংকট ফুটে উঠেছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমেছে ২-এর ঘরে। বাংলাদেশ এখনো মূলত দুইটি প্রবৃদ্ধির চালকের ওপর নির্ভরশীল—তৈরি পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্স। নতুন অর্থনৈতিক খাত, সৃজনশীল অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প এগিয়ে নিতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।

সবশেষে, জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার, মর্যাদা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। এই আকাঙ্ক্ষার শক্তিই সামনে এগোনোর পথে সবচেয়ে বড় পাথেয়। দুই বছর পর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব করতে হবে, তবে কে সফল বা ব্যর্থ—এই সংকীর্ণ প্রশ্নে না আটকে জুলাই যে সামাজিক শক্তি ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল, তা কতটা ধরে রাখা গেছে—সেটিই মুখ্য প্রশ্ন।