বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক মাস তিনি অনেকটাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছিলেন। তবে ধীরে ধীরে একটি অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ বা ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সক্রিয় হয়ে ওঠায় তার কাজের পরিধি সংকুচিত হয়। তিনি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।

তৌহিদ হোসেন জানান, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না পেলেও ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর কর্মপদ্ধতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উভয়েরই উপলব্ধি ছিল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে কোনো উষ্ণ সাড়া না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘটনা খুব অপ্রত্যাশিতও ছিল না।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রথম ফোনালাপের উদ্যোগ বাংলাদেশকেই নিতে হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে প্রধান উপদেষ্টা তাকে ভারত সফরের পরামর্শ দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে আমন্ত্রণ না জানানো পর্যন্ত সেখানে যাওয়া সমীচীন হবে না। এছাড়া ভারত সরকার ও ভারতের কিছু মহলে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব থাকায় সফরটি অর্থপূর্ণ হবে না বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

প্রথমবার পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশের ঘটনা প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, জেনেভায় আসিফ নজরুলকে নিয়ে ঘটনার পর তাকে একটি মধ্যাহ্নভোজে ডাকা হয়। সেখানে তাকে অভিযুক্তের মতো করে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমি বললাম, আমার কাজ হয়তো আপনাদের পছন্দ হচ্ছে না। আপনারা যদি এটা মনে করে থাকেন, প্লিজ, তাহলে অন্য কাউকে নিন। আমাকে সরে যেতে দিন।’ দ্বিতীয়বার তিনি পদত্যাগের কথা জানান ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে ঘটনার পর। সেবারও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যরা তাকে নিরুৎসাহিত করেন। তৃতীয়বার তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পর পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁকে বলছি, স্যার, আমি দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছি শুধু আপনি থাকবেন বলে। আপনি যদি মনে করেন, আমি সরে গেলে আপনার সুবিধা হবে, আমি সরে যাব।’

তৌহিদ হোসেন জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে প্রার্থিতার আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর কথা থাকলেও তা আর হয়নি। তিনি এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আগে থেকে অবহিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে ভারতসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের কাছে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূরক বাণিজ্যচুক্তি দায়িত্ব ছাড়ার তিন দিন আগে স্বাক্ষর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারত। তবে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বিষয়টি ভিন্ন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রথম ছয় মাসে সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ার আভাস থাকলেও নির্বাচনের ঘোষণার পর তা স্থবির হয়ে পড়ে। চীনের সঙ্গেও কিছু কিছু বিষয়ে অগ্রগতি থেমে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে খুব বেশি বিচলিত নই, কারণ আমি তো তদবির করে সেখানে যাইনি।’