একটি ভালো চাকরি পাওয়াকে জীবনের সাফল্যের মূল মাপকাঠি হিসেবে দেখা হতো। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের শুধু চাকরির জন্যই প্রস্তুত করত। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির এই সময়ে সেই ধারণা আমূল বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে স্বাবলম্বিতা মানে শুধু চাকরি খোঁজা নয়; বরং নিজের দক্ষতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নতুন পথ তৈরি করা। প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি তরুণ প্রজন্মকে এই পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য তৈরি করছি?
প্রযুক্তি জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে অসংখ্য সুযোগ। এখন আর সফল হতে রাজধানীতে থাকা, বড় অফিসে কাজ করা বা কারো সুপারিশের প্রয়োজন নেই। একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ ও নিজের দক্ষতাই একজন ব্যক্তির জীবন বদলে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন আমরা এমন অনেকের গল্প দেখি, যারা একসময় সাধারণ কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষক বা গৃহিণী ছিলেন। তারা নিজেদের বিশেষ দক্ষতাকে নিয়মিতভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরে পরিচিতি, জনপ্রিয়তা ও আয়ের নতুন পথ তৈরি করেছেন।
বাংলাদেশেও এর উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে। চিত্ত মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা আহসান হাবীব দেখিয়েছেন, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি ও ধারাবাহিক পরিশ্রমের সমন্বয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কীভাবে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হতে পারে। দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণী ইউটিউব, ফেসবুক, অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, কৃষি উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সংস্কৃতি তুলে ধরে নিজেরাই কর্মক্ষেত্র তৈরি করছেন। তারা চাকরির অপেক্ষা না করে নিজেরাই কাজের জায়গা সৃষ্টি করেছেন। এখানেই সমাজের জন্য বড় শিক্ষা নিহিত।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক তরুণ প্রস্তুতির চেয়ে ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজেকে গড়ে তোলার আগেই বড় আয়, বিলাসী জীবন, দামি মোবাইল ফোন ও ব্র্যান্ডের পোশাকের পেছনে ছোটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম জীবন প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় তারা জড়িয়ে পড়ে। বাস্তবতা হলো, প্রতিটি সফল মানুষের জীবনে এমন একটি সময় ছিল, যখন তিনি নীরবে নিজেকে তৈরি করেছেন। সেই সময় বাইরে থেকে কেউ দেখেনি, কিন্তু সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ঠিক তখনই।
প্রায়ই বলা হয়, ‘আমি দ্রুত কিছু করতে চাই’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিজেকে কি সেই কাজের জন্য প্রস্তুত করেছি? একজন চিকিৎসক হতে বছরের পর বছর পড়াশোনা করতে হয়, একজন গবেষককে অসংখ্য ব্যর্থতা মেনে নিতে হয়, একজন উদ্যোক্তাকে লোকসান ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়। একইভাবে একজন সফল কনটেন্ট নির্মাতা, প্রশিক্ষক বা অনলাইন উদ্যোক্তার পেছনেও দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে। কোনো সাফল্যই হঠাৎ করে আসে না।
অনেক শিক্ষার্থী প্রস্তুতির সময়টাকে সবচেয়ে বেশি অপচয় করছে। বই পড়া, নতুন দক্ষতা অর্জন, ভাষা আয়ত্ত করা, প্রযুক্তি ব্যবহারের কৌশল শেখা বা চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় হচ্ছে উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, অন্যের জীবন দেখে নিজেকে ছোট ভাবা ও অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায়। আগের প্রজন্মের একটি অলিখিত নিয়ম ছিল—ভোরে পড়তে বসা, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসা ও নিয়মিত জীবনযাপন। এই অভ্যাসগুলো আত্মশৃঙ্খলা শেখাতো। সময় ও জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু আত্মশৃঙ্খলার কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি।
চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির প্রতারক সক্রিয়। ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, অর্থ আত্মসাৎ ও অনৈতিক শর্তের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের হয়রানি করা হচ্ছে। বিশেষ করে অনেক তরুণী চাকরির আশায় প্রতারণা ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব নিশ্চিত করা যে, কেউ যেন কারো স্বপ্নকে পুঁজি করে দুর্বলতার সুযোগ না নেয়। তরুণদের বুঝতে হবে, দক্ষতা বাড়লে আত্মনির্ভরতা বাড়ে, আর আত্মনির্ভরতা বাড়লে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে। যোগ্য মানুষকে হয়তো সংগ্রাম করতে হয়, কিন্তু তাকে দীর্ঘদিন অবহেলা করে রাখা যায় না।
সমাজে সাফল্যের চেয়ে সাফল্য প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। দামি মোবাইল, ব্র্যান্ডের পোশাক ও সাজানো ছবি দেখে অনেক তরুণ মনে করেন, এটাই সফলতা। প্রকৃত সফল মানুষ জানেন, প্রথমে নিজের ওপর বিনিয়োগ করা উচিত—শিক্ষা, দক্ষতা, চরিত্র ও চিন্তার গভীরতার ওপর। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীর জন্য সংগ্রাম লজ্জার নয়, বরং এটি তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। যে তরুণ কষ্ট মেনে নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলে, ভবিষ্যৎ তার জন্যই অপেক্ষা করে।
আজ একজন কৃষক মাঠে কাজ করতে করতেই কবিতা আবৃত্তি করে লক্ষ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে পারেন। একজন গৃহিণী রান্নার ভিডিও দিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারেন। একজন শিক্ষক অনলাইনে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থী পড়াতে পারেন। একজন গ্রামের তরুণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ঘরে বসে কাজ করতে পারেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে বড় আহ্বান—নিজেকে তৈরি করার সময়কে সম্মান করা। আয়ের চেয়ে শেখাকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রস্তুতি ছাড়া অর্জন স্থায়ী হয় না। বীজ বপনের আগে ফসল পাওয়া যায় না, তেমনি দক্ষতা অর্জনের আগে সফলতা প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
আগের প্রজন্ম সীমিত সুযোগ নিয়েও অসীম পরিশ্রম করেছে। মানুষের সাফল্যের সৌন্দর্য তার অর্জনে নয়, বরং সেই অর্জনের পেছনের গল্পে। যে সাফল্যের পেছনে ঘাম, ত্যাগ ও ব্যর্থতা নেই, তা বেশি দিন টেকে না। এখনো সময় আছে। পরিবারকে সন্তানদের শুধু পরীক্ষার ফল নয়, দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব শেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে চাকরিপ্রার্থী নয়, সমস্যা সমাধানকারী মানুষ তৈরি করতে হবে। তরুণদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—আমি কি শুধু একটি চাকরি চাই, নাকি এমন একজন মানুষ হতে চাই, যার দক্ষতা অন্যের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে?
এমন একটি প্রজন্ম দেখার আশা করা যায়, যারা সুপারিশের অপেক্ষায় থাকবে না; বরং নিজের যোগ্যতায় পথ তৈরি করবে। যারা বাহ্যিক চাকচিক্যের মোহে নয়, আত্মমর্যাদা, সততা, জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা সময়কে অজুহাত বানায় না; বরং সময়ের পরিবর্তনকে নিজের শক্তিতে পরিণত করে। স্বাবলম্বিতার নতুন সংজ্ঞা তাই একটাই—নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে একদিন কাজকে খুঁজতে না হয়; কাজই আপনাকে খুঁজে নেয়। সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।


