মহাকাশের ধূলিকণা ও ধূমকেতুর অবশেষ যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন সৃষ্টি হয় আলোর এক অপরূপ খেলা। আজ বুধবার রাতে সেই দৃশ্যই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মিলবে বাংলাদেশের আকাশে। আগস্ট মাসে প্রতি বছরই পারসেইড উল্কাবৃষ্টি দেখা গেলেও এবার এটি আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এর মূল কারণ হলো নতুন চাঁদ বা অমাবস্যা। পৃথিবীর দিকে চাঁদের যে অংশ রয়েছে তা সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকায় আকাশে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থান করায় রাতের আকাশ থাকবে একেবারে অন্ধকার, ফলে উল্কাবৃষ্টি পর্যবেক্ষণ অনেক সহজ হবে।

পারসেইড উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ রূপ দেখা যাবে আজ রাত ও আগামীকাল ভোরের মধ্যে। পরিবেশ যথেষ্ট অন্ধকার থাকলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০টি উল্কা বা ছুটন্ত তারা দেখতে পাওয়া সম্ভব। উত্তর গোলার্ধের পাশাপাশি মধ্য-দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকেও এই উল্কাবৃষ্টি পরিষ্কার দেখা যাবে। আগস্ট মাসে উত্তর-পূর্ব আকাশে পারসেয়াস নক্ষত্রমণ্ডল উদিত হয়। আকাশে পারসেয়াস খুঁজে পাওয়া কঠিন হলে ক্যাসিওপিয়া নক্ষত্রমণ্ডলের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। উত্তর দিকে ইংরেজি ডব্লিউ (W) আকৃতির ক্যাসিওপিয়া খুঁজে পেলে তার কাছেই পারসেয়াস নক্ষত্রমণ্ডলের অবস্থান পাওয়া যাবে।

উল্কাবৃষ্টি দেখার জন্য প্রয়োজন সঠিক সময় আর পর্যাপ্ত ধৈর্য। মধ্যরাত থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত এই দৃশ্য দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। মাটিতে চাদর বিছিয়ে বা হেলে থাকা চেয়ারে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্ধকারের সঙ্গে চোখ খাপ খাইয়ে নিতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগতে পারে। টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলার ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ দ্রুতগতিতে চলা উল্কা এগুলোর মাধ্যমে দেখা নাও যেতে পারে। তাই খালি চোখেই এই দৃশ্য উপভোগ করা সবচেয়ে ভালো। এ সময় স্মার্টফোনের দিকে তাকানোও এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ ফোনের সাদা আলো রাতের দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয়।

এই ছুটন্ত তারাগুলো আসলে প্রকৃত তারা নয়; এগুলো মেটিওরয়েড নামে পরিচিত ছোট পাথরের কণা। ভূমি থেকে প্রায় ৯৭ কিলোমিটার ওপরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করার সময় প্রচণ্ড বেগে জ্বলে উঠে এগুলো আলোকিত হয়। আমেরিকান মেটিওর সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, পারসেইডের উল্কাগুলো ঘণ্টায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ কিলোমিটার বেগে বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে। ধূমকেতু বা গ্রহাণুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণার মধ্য দিয়ে পৃথিবী অতিক্রম করার সময়ই মূলত উল্কাবৃষ্টি দেখা যায়। পারসেইড উল্কাবৃষ্টির সময় মাঝে মাঝে অত্যন্ত উজ্জ্বল ফায়ারবলও দেখা যায়।

আমেরিকান মেটিওর সোসাইটির ফায়ারবল রিপোর্ট সমন্বয়কারী রবার্ট লুনসফোর্ড জানান, ধূমকেতু থেকে যত বেশি কণা নির্গত হবে, ফায়ারবল তৈরির সম্ভাবনাও তত বাড়বে। পারসেইড উল্কাবৃষ্টির উৎস হলো ১০৯পি/সুইফট-টার্টল ধূমকেতু, যা ১৯৯২ সালে শেষবার সৌরজগতের ভেতরের অংশে এসেছিল। ২১২৬ সালের আগে এটি আর ফিরে আসবে না বলে জানা গেছে। এই ধূমকেতুটির নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্র বেশ বড় — যার ব্যাস প্রায় ২৬ কিলোমিটার। লুনসফোর্ড আরও বলেন, ধূমকেতুটি সৌরজগতের ভেতর দিয়ে বহুবার অতিক্রম করেছে। অন্যান্য উল্কাবৃষ্টির তুলনায় পারসেইডের জনপ্রিয়তার কারণ হলো এর সময়কাল — উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে হওয়ায় মানুষ সহজেই এটি পর্যবেক্ষণ করতে পারে, অন্যদিকে শীতকালে হওয়া অন্যান্য উল্কাবৃষ্টি ঠান্ডার কারণে ততটা দেখা যায় না। সূত্র: লাইভ সায়েন্স।