বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (সিইও) মারধর, প্রাণনাশের হুমকি ও জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা প্রতিবেদন আমলে নিয়ে এই নির্দেশ দেন। এর ফলে কারাবন্দী সালমান এফ রহমান এখন এই মামলারও আসামি হিসেবে আটক রয়েছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্বাস উদ্দীন জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদ রানা ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারসহ মোট ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে মো. মনিরুল ইসলাম খান ও খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন। অন্যদিকে মামলার প্রধান আসামি আব্দুর রউফ তালুকদারসহ বাকি তিনজন এখনো পলাতক রয়েছেন।

২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন বিআইএফএফএলের সাবেক সিইও এস এম ফরমানুল ইসলাম। আদালত তখন অভিযোগটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। মামলায় সালমান এফ রহমান ছাড়াও সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বিআইএফএফএলের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এস এম ফরমানুল ইসলামকে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুল অঙ্কের ঋণ ও বিনিয়োগ–সুবিধা দিতে অনৈতিক চাপ দেওয়া হয়। বিশেষ করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন 'তিস্তা সোলার' প্রকল্পের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) ঋণ ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় তৎকালীন সিইও ফরমানুল ইসলাম সেই প্রস্তাবে রাজি হননি।

এজাহারে আরও বলা হয়, ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ফরমানুল ইসলামের ওপর চাপ আরও বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ২০০ কোটি টাকার জিরো কুপন বন্ডে আগাম বিনিয়োগ এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো জামানত ছাড়াই শতকোটি টাকার ঋণ ছাড়ের চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত জটিলতা থাকায় সেই প্রস্তাবেও সম্মতি দেননি ফরমানুল ইসলাম।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই বিআইএফএফএলের ৮০তম পর্ষদ সভায় কাঙ্ক্ষিত ঋণ ও বিনিয়োগ–সুবিধা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ফরমানুল ইসলামের ওপর চড়াও হন আসামিরা। তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধর করা হয়। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক তার কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার দাপ্তরিক মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন, প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবহারে বাধা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির চাবি কেড়ে নেওয়া হয়। এমনকি তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়।

জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মারধর, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের এসব অভিযোগ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। আসামিরা আদালতে হাজির না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর মামলার ৩ নম্বর আসামি মনিরুল ইসলাম খান ও ৫ নম্বর আসামি খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।

মামলার বাদী এস এম ফরমানুল ইসলাম বলেন, ২০১৯ সালে আব্দুর রউফ তালুকদার যখন ফাইন্যান্স সেক্রেটারি ছিলেন, তখন তিনি অতিমাত্রায় খবরদারি শুরু করেন। তিনি বলেন যে সালমান এফ রহমানকে টাকা দিতে হবে, তিস্তা সোলার প্রজেক্টে লোন দিতে হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর আগে সালমান এফ রহমান তাকে চাপ দিতেন। তিনি তখন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ছিলেন এবং টাকা দিতে চাননি। নাফিস শারাফাতও অবৈধ লোন দাবি করেন। তাদের কথা না শোনায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং কোনো প্রকার নোটিশ ছাড়া বের করে দেওয়া হয়। পরদিন তিনি গুলশান থানায় গিয়ে জিডি করেন, কিন্তু এতে কোনো সুরাহা হয়নি। এখন আদালত এই মামলায় সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন বলে জানান তিনি।