বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে প্রবাসী নাগরিকদের নথি সত্যায়নে একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ না করার ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে বিচার বিভাগীয় নির্দেশ জারি করেছে হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। বিবাহ নিবন্ধন, জন্মনিবন্ধন, সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার কিংবা শিক্ষাগত সনদ—প্রবাসীদের জন্য এসব নথি বৈধকরণে অভিন্ন সার্কুলার, নির্বাহী নির্দেশনা ও প্রশাসনিক গাইডলাইন না থাকায় কোন মিশনে কোন পদ্ধতিতে কাজ হয় তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো মিশন অ্যাপোস্টিল করা নথি গ্রহণ করলেও অন্য মিশনগুলো অতিরিক্ত প্রত্যায়ন বা পাল্টা সত্যায়নের শর্ত আরোপ করছে বলে রিটে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আইনজীবী নূর ই আলম রিটটি দায়ের করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান, তাকে সহায়তা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও মো. আরশাদুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খাঁন জিয়াউর রহমান। রুলে হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশন অনুযায়ী উৎস দেশে বৈধভাবে অ্যাপোস্টিল করা সরকারি নথি অতিরিক্ত সত্যায়ন ছাড়া গ্রহণের জন্য বিদেশের সব মিশনে অভিন্ন নির্বাহী নির্দেশনা জারি ও বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওই কনভেনশনের বাস্তবায়ন নিশ্চিতে দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনস্যুলেটগুলোর প্রতি অবিলম্বে অভিন্ন সার্কুলার জারি করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তাও প্রশ্ন হিসেবে রাখা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের সার্কুলার এবং ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বরের এসআরও বিদেশের সব বাংলাদেশ মিশনে বাস্তবায়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সেটিও রুলের আওতায় এসেছে। শুনানিতে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, বিদেশে কর্মরত, পড়ুয়া বা বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্মসনদ, বিবাহসনদ, শিক্ষাগত সনদ, আদালতের নথি ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাংলাদেশে ব্যবহার করতে হয়। উৎস দেশে এসব নথি নোটারাইজড ও অ্যাপোস্টিল করার পরও বাংলাদেশ মিশন থেকে আবার সত্যায়ন বা পাল্টা সত্যায়ন নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। একই নথির জন্য একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে প্রবাসীদের, যা অত্যন্ত ভোগান্তির।
কোনো কোনো দেশে দূতাবাস অবস্থিত হচ্ছে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে, ফলে সেখানে যেতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ পোহাতে। অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষা, কর্মস্থল থেকে ছুটি, যাতায়াত ও আবাসন ব্যয় এবং কুরিয়ারে মূল নথি পাঠানোর ঝুঁকি—সব মিলিয়ে প্রবাসীরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অতিরিক্ত সত্যায়নের কারণে কয়েক সপ্তাহ বা মাস চলে যেতে পারে, যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময়সীমা পার হয়ে যেতে পারে এবং চাকরিতে যোগদান বিলম্বিত হতে পারে। ভিসা বা অভিবাসন প্রক্রিয়াও আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিবাহ নিবন্ধন, সন্তানের জন্মনিবন্ধন কিংবা সম্পত্তি হস্তান্তরের মতো জরুরি কাজগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। একই নথির জন্য বারবার অর্থ ব্যয় শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং এটি বাস্তবিক অর্থে প্রবাসীদের জন্য এক ধরনের হয়রানি বলেও আদালতকে জানানো হয়েছে। প্রবাসীদের এই ভোগান্তি নিরসনেই মূলত রিটটি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আইনজীবী।




