বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ-প্রধানদের (সিএফও) ভূমিকা এখন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্প্রতি ম্যাককিন্স অ্যান্ড কোম্পানি তাদের ২৪তম বার্ষিক গ্লোবাল সিএফও ফোরামের আয়োজন করে, যেখানে ৩০টিরও বেশি দেশের প্রায় ১০০ অর্থ-প্রধান অংশ নেন। এই ফোরামের আলোচনা থেকে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো—কর্পোরেট কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব এখন ক্রমবর্ধমান হারে সিএফওদের ডেস্কেই পৌঁছে যাচ্ছে।
ম্যাককিন্সির সিনিয়র পার্টনার এবং প্রতিষ্ঠানটির স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড কর্পোরেট ফাইন্যান্স অনুশীলনের বৈশ্বিক সহ-প্রধান অ্যান্ডি ওয়েস্ট ফোরামে উপস্থিত অর্থ-প্রধানদের মধ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করেন। তাতে দেখা যায়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সিএফওর কাছেই তাদের কোম্পানির কৌশল বিভাগ সরাসরি রিপোর্ট করে। ওয়েস্টের মতে, পাঁচ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে। তিনি বলেন, 'আমরা নিঃসন্দেহে একটি নতুন যুগে পা দিয়েছি।'
শুধু সাংগঠনিক কাঠামোতেই নয়, বাজারের প্রতিযোগিতার তীব্রতা মোকাবিলা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের এই সময়ে সিএফওরা এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন। ম্যাককিন্সি যাকে 'শাফল রেট' বা বাজারে কোম্পানিগুলোর অংশীদারত্ব অর্জন ও হারানোর হার বলে অভিহিত করছে, তা ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এই চিত্র জয়ী ও পরাজিতদের দ্রুত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষাপটে, মূলধন বরাদ্দ, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বাজি—যে কাজগুলো একসময় সিইও বা কৌশল প্রধানদের একচ্ছত্র অধিকার ছিল—সেগুলোতেই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিএফওরা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এই বিবর্তনকে আরও দ্রুততর করে তুলছে। ‘গত কয়েক বছর ধরে আমরা এই সম্মেলনে এআই নিয়ে কথা বলে আসছি,’ উল্লেখ করেন ওয়েস্ট। গত বছর অর্থ-নেতারা এআই নিয়ে এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত থাকলেও, এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পুরো প্রতিষ্ঠান জুড়ে এর রূপান্তরমূলক প্রভাব। ওয়েস্টের ভাষ্য, ‘এআই কোনো প্রকল্প বা খরচ কমানোর অস্ত্র নয়—এটি কাজ করার একটি সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি। আর এর একেবারে সামনের সারিতে রয়েছেন সিএফওরা।’
এখন অর্থ-প্রধানদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তারা গ্রাহক পরিচালনা থেকে শুরু করে পূর্বাভাস পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে এআই-এর প্রভাব নিরূপণ করবেন এবং একইসঙ্গে এর প্রয়োগে নেতৃত্ব দেবেন। কিছু প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিভাগ নিজেরাই এআই-এর প্রাথমিক ব্যবহারকারী হিসেবে কাজ করছে, যা পূর্বাভাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিশ্লেষণে উন্নতি আনছে। তবে কীভাবে এআই বিনিয়োগ মূল্যায়ন করতে হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। কোম্পানিগুলো তাদের শিল্প ও কৌশলগত অগ্রাধিকার অনুযায়ী বিভিন্ন পন্থা নিচ্ছে এবং টোকেন মূল্য, অবকাঠামো, ভেন্ডর নির্ভরতা ও পুঁজি বরাদ্দের মতো দীর্ঘমেয়াদি খরচ বিবেচনায় রাখছে।
এআই যুগে প্রতিভা ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও, ওয়েস্টের মতে প্রকৃত বড় বাধা হলো সাংগঠনিক রূপান্তর। ‘পরিবর্তন ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ,’ তিনি মন্তব্য করেন। মানুষ যখন এআই বাস্তবায়নের গভীরে প্রবেশ করে, তখন তারা বুঝতে পারে প্রকৃত মূল্য কোনো কাজ সরিয়ে নেওয়ার মধ্যে নয়, বরং কাজ করার পদ্ধতি আমূল বদলে দেওয়ার মধ্যে নিহিত।
সব চাপ সত্ত্বেও, সিএফওদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য আশাবাদ লক্ষ্য করা গেছে। ফোরামে অংশ নেওয়া অর্থ-প্রধানরা কেবল নিজ নিজ কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়েই নন, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চালনায় কর্পোরেট জগতের ভূমিকা নিয়েও আস্থা প্রকাশ করেছেন। স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিনতর হচ্ছে, প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং কৌশল বাস্তবায়ন জটিলতর হচ্ছে। তবে অ্যান্ডি ওয়েস্টের মতে, এই অস্থিরতার সময়েই বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘একজন সিএফও হওয়ার জন্য এটি সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সময়। তাদের হাতে প্রভাব ফেলার মতো আগের চেয়ে অনেক বেশি হাতিয়ার রয়েছে।’



