দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান তারল্যসংকট ও আমানত ফেরত পেতে বিলম্বের কারণে করনীতি সংক্রান্ত একটি জটিল প্রশ্ন সামনে এসেছে। করদাতাদের এমন আয়ের ওপরও কর দিতে হচ্ছে, যা তারা বাস্তবে হাতে পাননি। এই ইস্যুটি শুধু আইনগত নয় বরং ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং করনীতির মৌলিক দর্শনের সঙ্গেও জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে বহু আমানতকারী জানিয়েছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ডিপিএস বা এফডিআর নগদায়নে বাধার সম্মুখীন হয়ে তারা বাধ্যতামূলক পুনর্বিনিয়োগ করছেন। করদাতা নিজ ইচ্ছায় নয় বরং ব্যাংকের আর্থিক অক্ষমতার কারণে নিজের অর্থই তুলতে পারছেন না, আর এই পরিস্থিতিতে অর্জিত সুদের ওপর কর আরোপ তাঁদের জন্য দ্বৈত চাপ তৈরি করছে।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৬২ অনুযায়ী ব্যাংকে রাখা আমানতের সুদ বা মুনাফা ‘আর্থিক পরিসম্পদ হতে আয়’ হিসেবে গণ্য হয়। ধারা ৬৩-এ এই আয় করযোগ্য হওয়ার জন্য ‘প্রাপ্ত বা অর্জিত, যেটি আগে’ নীতি প্রযোজ্য। ফলে ব্যাংক যদি সুদ হিসাবভুক্ত করে গ্রাহকের নামে দায় হিসেবে দেখায়, তবে তা ‘অর্জিত’ আয় হিসেবে বিবেচিত হয় — যদিও গ্রাহক সেই অর্থ উত্তোলন করতে অক্ষম হন। একই আইনের ধারা ১০২ অনুসারে সুদ গ্রাহকের হিসাবে জমা হলে বা প্রকৃত পরিশোধ করা হলে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। ধারা ১৭৩-এর আওতায় রিটার্ন দাখিলের আগে মোট করদায় থেকে উৎসে কর্তিত কর বাদ দিয়ে অবশিষ্ট কর পরিশোধ করতে হয়। আইনের এই বিধানগুলো একসঙ্গে প্রয়োগ করলে নগদ অর্থ হাতে না পেয়েও একজন করদাতার করদায় সৃষ্টি হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের অবস্থা সরকারি ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেই স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণের হার দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ৯ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা ২০ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছায়। সর্বশেষ ত্রৈমাসিক তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে তারল্য-সহনশীলতা পরীক্ষায় ১৮টি তফসিলি ব্যাংক নির্ধারিত চাপ মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের জুনেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এই ক্রমবর্ধমান চাপের কথা উল্লেখ করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ প্রণীত হয়েছে। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন বাংলাদেশ ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন ও ব্রিজ ব্যাংকসহ বিভিন্ন রেজোল্যুশন ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং আইন এখন স্বীকার করছে যে কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থায় আমানতকারীর অর্থপ্রাপ্তি বিলম্বিত হতে পারে। অথচ কর আইনে আটকে থাকা সুদের জন্য পৃথক কোনো বিধান নেই।

এই বাস্তবতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সামনে নীতিগত সুযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এনবিআর একটি ব্যাখ্যামূলক পরিপত্র জারি করে অনাদায়ি সুদের ওপর কর প্রকৃত অর্থপ্রাপ্তির আগপর্যন্ত স্থগিত রাখতে পারে। পাশাপাশি আয়কর আইন, ২০২৩-এ একটি বিশেষ বিধান সংযোজন করে স্পষ্ট করে দেওয়া যেতে পারে যে তারল্যসংকট, নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ বা আদালতের আদেশের কারণে অনাদায়ী সুদ প্রকৃত প্রাপ্তির আগে করযোগ্য হবে না। উৎসে কর কর্তনের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার দাবিও রাখে। প্রকৃত অর্থ পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের ব্যবস্থা করলে করদাতা, ব্যাংক ও সরকারের স্বার্থে ভারসাম্য আসতে পারে। অথবা সরকার রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে বর্তমান ব্যবস্থা বহাল রাখতে চাইলে অন্তত ধারা ১৭৩-এর আওতায় অতিরিক্ত কর পরিশোধের ক্ষেত্রে স্থগিত পরিশোধের বিধান চালু করা যেতে পারে, যাতে করদাতা প্রকৃত অর্থ হাতে পাওয়ার পর অবশিষ্ট কর পরিশোধ করতে পারেন।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের পাশাপাশি করনীতি যদি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে তা সঞ্চয় সংস্কৃতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করবে। করব্যবস্থা শুধু আইনের ভাষার ভিত্তিতে নয়, বরং ন্যায়বিচার ও জনআস্থার ওপর টিকে থাকে। পরিবর্তিত ব্যাংকিং বাস্তবতার আলোকে আয়কর আইন, ২০২৩-এর এই নীতিগত শূন্যতা পূরণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।